রমজানে নেক আমল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২১, ২১:৩৫

 আল্লামা শাহ্ সালাহ্ উদ্দীন

 

রহমত বরকত মাগফেরাত ও নাজাতের মাস পবিত্র রমজান। এ মাস ফজিলতের মাস, গুনাহ মাফের মাস, নেক আমল দিয়ে নিজেকে সাজানোর মাস। মাহে রমজানকে বলা হয় মুসলমানদের নেকি অর্জনের মৌসুম। তাই রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত যাতে কাজে লাগানো যায়, সেই প্রচেষ্টা সবার থাকা উচিত। এ মাসে আমরা কী করব, কীভাবে চলব, আমলে সালেহ্ দ্বারা কীভাবে নিজেদের গঠন করব, সে ব্যাপারে সবাইকে তত্পর হওয়া দরকার।

আমলে সালেহ্ বা নেক আমলের ভিত্তি হচ্ছে ইমান। ইমান ছাড়া ভালো কাজের কোনো মূল্য নেই। সুরা নাহলের ৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ করেন, ‘ইমানের সাথে যে কোনো পুরুষ বা নারী আমলে সালেহ করবে, আমি তাকে দান করব উত্তম পবিত্র জীবন। আর তাদের পুরস্কৃত করব তাদের সবচেয়ে ভালো কাজগুলোর ভিত্তিতে।’ রমজানের সিয়াম হচ্ছে সবচেয়ে বড় আমলে সালেহ্। দীর্ঘ এক মাস কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে আমাদের আমলি জিন্দেগি গঠিত হয়।

এই পবিত্র মাহে রমজানে আমাদের জীবনকে যেসব নেক আমল দ্বারা সুসজ্জিত করতে হবে তা হলো—আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করব না, শিরকমুক্ত জিন্দেগি গঠন করব। সবকিছুর ফায়সালাকারী হচ্ছেন আল্লাহ। আমরা তাকেই উত্তম ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেব। তার রসুলকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে পরিপূর্ণ অনুসরণ করব। ইমানের সঙ্গে আমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হব। আল্লাহ সুরা বাকারায় ঘোষণা দিয়েছেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। অবশ্যই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’

আমরা নামাজ ও রোজায় অটল থাকব। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা জাকাত ও হজ আদায় করব। বিপদে ধৈর্য ধারণ করব। আল্লাহপ্রদত্ত নেয়ামতের শোকর আদায় করব। ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করব। সবার প্রতি সদ্ব্যবহার করব। আল্লাহর অধিকারের প্রতি যথাযথ মনোনিবেশ করব। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা রেখে ইবাদত-বন্দেগি করব। মানুষের অধিকারের প্রতি যত্নশীল হব। অপরের সম্পদ আত্মসাত্ করব না। কাউকে ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূরণ করব। সর্বদা সত্য কথা বলবা মিথ্যা বলব না। সর্বপ্রকার অশ্লীলতা থেকে নিজেকে দূরে রাখব। সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চলব। শাস্তিদানের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যায়কারীকে ক্ষমা করার চেষ্টা করব। আল্লাহর সব সৃষ্টির সেবা করব। সমাজে সবার সঙ্গে মিলেমিশে একতাবদ্ধ হয়ে চলব। ধনসম্পদে গরিবের যে হক রয়েছে, তা আদায় করব। পরিশ্রম করতে লজ্জাবোধ করব না। বিলাসিতা ও অপচয় থেকে দূরে থাকব। কখনো কৃপণতা করব না। পর্দা রক্ষা করে শালীনতার মধ্য দিয়ে চলাফেরা করব। গোনাহ হয় এমন কাজ বা ধারণা থেকে দূরে থাকব। কারোর গোপনীয় বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করব না। বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করব। তাহাজ্জুদের অভ্যাস গড়ে তুলব। নফল নামাজগুলোর প্রতি যত্নবান হব। অপরের প্রতি সহমর্মিতা ও সৌহার্দ বজায় রেখে চলব। এসব আমলে সালেহ্র মাধ্যমে আমাদের সুন্দর জীবন গঠন হবে।

যেসব ব্যবসায়ী রমজান মাসকে ব্যবসার উপলক্ষ্য বানিয়ে অধিক মুনাফার আশায় খাদ্যে ভেজাল, ওজনে কম ও বিভিন্ন ছলচাতুরি করে থাকেন, তারাও রোজার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হন। মানবিকভাবে যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে পবিত্র মাহে রমজানে এক মুসলমান অপর মুসলমান ভাইকে বেশি সহযোগিতা করার কথা। এরূপ অবস্থায় ব্যবসায়ী সমাজ যদি মূল্য বাড়িয়ে মুসলমানদের কষ্ট দেয়, তাহলে এর পরিণাম কী হতে পারে তা তাদের ভেবে দেখা উচিত। শুধু পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম সাধনা নয়; বরং যাবতীয় পাপাচার থেকে নিজের নফ্স ও প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে দুনিয়ার সব লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানোই রমজানের প্রকৃত শিক্ষা।

পবিত্র মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা আমাদের এমন ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতে শেখায়। সুরা হাদিদের ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি অবশ্যই আমার রসুলদের সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ পাঠিয়েছি। আমি তাদের সঙ্গে কিতাব পাঠিয়েছি। আরো পাঠিয়েছি এক মানদণ্ড, যাতে করে মানুষ এর মাধ্যমে ইনসাফের ওপর কায়েম থাকতে পারে।’

ইনসাফ কায়েম করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। ব্যক্তি ও মানবজীবনের সব শাখায় শরিয়তসম্মত জীবনবিধানে যার যে পাওনা রয়েছে, তা বুঝিয়ে দেওয়ার নামই ইনসাফ। রোজা আমাদের এই সততা ও ইনসাফের শিক্ষা দেয়।

lলেখক :চট্টগ্রাম জামেয়া ওবাইদিয়া নানুপুর মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও বর্তমান পির সাহেব, নানুপুর