গত ১৯ এপ্রিল রিমান্ডকালীন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক আইনের দৃষ্টিতে কয়েকটি তাত্পর্যপূর্ণ কথা বলেছেন বলে দেশের কমবেশি সব গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
স্বীকারোক্তি হিসেবে সেটিই সাক্ষ্য আইনে গ্রহণযোগ্য, যেটি আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা অনুযায়ী একজন বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ব্যক্ত করেন। অবশ্য সাক্ষ্য আইন এ ধরনের বাইরে করা স্বীকারোক্তিও সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য। তবে সে ধরনের স্বীকারোক্তি পুলিশের কাছে দিলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তার পরও পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি করলে তা সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধের তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য আবিষ্কার করতে পারে পুলিশ। সাধারণ রিমান্ডে পুলিশের কাছে কী বলল তা প্রকাশ না হওয়ার কথা থাকলেও সচরাচর পুলিশ থেকেই এসব কথা ফাঁস হয়ে থাকে। গণমাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমে চলে যায় এবং সে অর্থে মামুনুলের বক্তব্য সম্পর্কে যেসব কথা, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বস্ত জাতীয় দৈনিকে যা লেখা হয়েছে তা অবিশ্বাস করার অবকাশ নেই বললেই চলে। বিশেষ করে, পুলিশ যখন এসব সংবাদের সত্যতা চ্যালেঞ্জ করছেন না। গুরুত্বপূর্ণ বহু পত্রিকায় মামুনুলের স্বীকারোক্তি বলে যেসব কথা ছাপা হয়েছে তার মধ্যে তাত্পর্যপূর্ণগুলো হলো এই যে মামুনুল প্রথম একটি বৈধ বিয়ে ছাড়াও আরো দুটি কাবিনবিহীন বিয়ে করেছে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী মামুনুল আরো বলেছে, তার তথাকথিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিয়ে চুক্তিভিত্তিক বিয়ে এবং কথিত তৃতীয় স্ত্রীকে খুশি রাখার জন্য তাকে তার মাদ্রাসায় চাকরি দিয়েছে। এসবের প্রযুক্তিগত প্রমাণও আছে। রয়েছে ভিডিও চিত্রও। সে সব নিয়ে আমি বিশেষ কিছু বলতে চাই না। আমি শুধু আইনি বিষয় আলাপ করব, কেননা আমি আইনের মানুষ, ধর্ম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই।
বিয়ে ও তালাকসংক্রান্ত আইনগুলো হচ্ছে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ এবং ১৯৭৪ সালের বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন, যা ২০০৫ সালে সংশোধন করা হয়। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশই এদেশে এখন পর্যন্ত গৃহীত হয়ে থাকে।
১৯৬১ সালের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী একাধিক বিয়ে করতে হলে অবশ্যই আর্বিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হয়। এই অনুমতি দেওয়ার একমাত্র এক্তিয়ার আর্বিট্রেশন কাউন্সিলের, বর্তমানে স্ত্রীর কোনো এক্তিয়ার নেই বহুবিবাহের অনুমতি প্রদানের। তবে বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া আর্বিট্রেশন কাউন্সিল অধিক বিয়ের অনুমতি দিতে পারে না। আর শুধু বর্তমান স্ত্রীর অনুমতিই যথেষ্ট নয়। একাধিক বিয়ের অনুমতি দিতে হলে আর্বিট্রেশন কাউন্সিলকে আরো দুটি বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে, যার একটি হলো এই যে অধিক বিয়ের প্রয়োজন রয়েছে এবং অপরটি হলো এই যে অধিক বিয়ের দাবি যৌক্তিক। এই তিনটি উপাদান, যথা—(১) বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি, (২) বিয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং (৩) বিয়ের যৌক্তিকতা—পূরণ না হলে আর্বিট্রেশন কাউন্সিল অনুমতি দিতে পারে না। আর অনুমতি ছাড়া অধিক বিয়ে করলে প্রতিটি অধিক বিয়ের জন্য সাজা ১ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড। সে অর্থে মামুনুল হকের অনুমতিহীন দুটি বিয়ের জন্য দুই বছর সাজা হতে পারে। তা ছাড়াও অনুমতিহীন বিয়ে নিবন্ধন করা অর্থাত্ কাবিন করা যায় না।
১৯৭৪-এর বিবাহ এবং তালাক নিবন্ধন আইন অনুযায়ী প্রতিটি বিয়ের নিবন্ধন বা কাবিন করা বাধ্যতামূলক। কেউ এই বিধান লঙ্ঘন করলে প্রতিটি লঙ্ঘনের সাজা দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। দুটি নিবন্ধনহীন বিয়ে করার জন্য মামুনুল হকের চার বছরের সাজা হতে পারে এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।
মামুনুলের প্রকাশিত স্বীকৃতি অনুযায়ী সে তার দাবিকৃত তৃতীয় স্ত্রী জান্নাতকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য তাকে মামুনুলের মাদ্রাসায় চাকরি দিয়েছিল। তার এই আত্মস্বীকৃত স্বজনপ্রীতি দুর্নীতি দমন আইনের ৫ ধারায় অপরাধ হতে পারে, কেননা মাদ্রাসাসহ যেসব সংস্থা সরকারের প্রণোদনাপ্রাপ্ত হয় তাদের কর্মকর্তারা আইন অনুযায়ী পাবলিক সার্ভেন্ট (গণকর্মকর্তা)। আর সে যে মাদ্রাসায় শিক্ষক তা যদি পাবলিক ট্রাস্ট হয়, তাহলে তাতে কাউকে স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে চাকরি দিলে তা দুর্নীতি বটে, যার জন্য মামুনুলের সাজা হতে পারে।
মামুনুল বলেছে, তার পরবর্তী দুটি বিয়ে ‘চুক্তিভিত্তিক’ বিয়ে। আমাদের দেশে মুসলমানদের বিবাহসংক্রান্ত আইনে ‘চুক্তিভিত্তিক’ বিয়ে নামক কোনো বিধান বা তত্ত্ব স্বীকৃতি নয় বিধায় পরবর্তী দুটি বিয়ে অবশ্যই অবৈধ। আমাদের আইনে বিয়ে মানে নিরঙ্কুশ, শর্তশূন্য বিয়ে, যদিও তালাকের অধিকার থাকে। কিন্তু স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান, দেনমোহরের অর্থ এবং ভরণপোষণের কথা ছাড়া কোনো শর্ত থাকতে পারে না। এ অবস্থায় দণ্ডবিধির বেশ কয়েকটি ধারামতে মামুনুলের কঠিন সাজা হতে পারে। দ্লবিধির ৪৯৩ ধারা থেকে ৪৯৬ ধারা পযৃণ্ত বিয়ে সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান আছে যার অধিকাংশ অপরাধই জামিন অযোগ্য। দণ্ডবিধির ৪৯৩ ধারায় বলা আছে কোনো পুরুষ এমন কোনো নারীকে, যে নারীর সঙ্গে তার বৈধ বিবাহ হয়নি, এমনটা বুঝিয়ে তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক করে যে সে তার আইনসংগতভাবে বিবাহিত স্ত্রী, তাহলে সে পুরুষের সাজা ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।
৪৯৬ ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি বৈধ বিবাহ না করে যদি এমনভাবে কোনো ভুয়া বিয়ের ঘটনা মঞ্চায়ন করে, যেন যে তার বৈধ বিয়ে হলো, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাজা সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।
আরো একটি প্রমাণিত ঘটনা হলো এই যে, মামুনুল হক সোনারগাঁও রিসোর্টে রুম নেওয়ার সময় তার সঙ্গী নারীর সম্বন্ধে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছেন। এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে নারী সঙ্গীর ব্যাপারে সঠিক তথ্য দিলে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তাকে রুম বরাদ্দ দিত না, রুমের চাবি দিত না। কারণ এসব ব্যাপারে এই রিসোর্ট যথেষ্ট সতর্ক থাকে বলেই আমার ধারণা। এ ব্যাপারে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা বলছে, কোনো ব্যক্তি মিথ্যা তথ্য দিয়ে, তথা প্রতারণার মাধ্যমে প্রতারিত ব্যক্তিকে কোনো সম্পদ প্রদানে প্ররোচিত করলে তার সাজা সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদন্ড।
উল্লেখ্য, প্রতারণামূলকভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রুমের দখল নেওয়া, চাবি নেওয়াও ৪২০ ধারাভুক্ত হতে পারে, কেননা এখানে প্রতারণা করে রুমের দখল নেওয়া হয়েছে, যা সঠিক তথ্য দিলে দেওয়া হতো না। এ ছাড়াও দণ্ডবিধির ৪১৭ ও ৪১৯( প্রতারণা ও মিথ্যা পরিচয় প্রদান করে প্রতারণা) ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে। তবে বাদী হতে হবে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে। একইভাবে ৬১ সালের অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করে অধিক বিয়ে করলেও বাদী হতে হবে যে কোনো স্ত্রীকে। তবে ১৯৭৪-এর বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন ভঙ্গের অপরাধে কোনো স্ত্রীকে বাদী হওয়ার প্রয়োজন নেই। এছাড়া দণ্ডবিধির যে অপরাধগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর জন্যও কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে বাদী হতে হয় না।
n লেখক :আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

