স্কুলে আমি :রোকেয়া ইসলাম, কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২১, ২০:২১

আমার নিজ গ্রাম ছেড়ে পরিচিত স্বজন ছেড়ে মা বাবার স্নেহময় পরিবেশ ছেড়ে আমাকে চলে আসতে হলো ঢাকায়। অপরিচিত ঢাকা শহরের কিছুই ভালো লাগতো না, কোনো এক মামার হাত ধরেই স্কুলে গিয়েছিলাম এটুকু মনে পড়ে।

আমি মোট দুটো স্কুলে পড়েছি একটা  রোটারি প্রাইমারি স্কুল অন্যটা বিন্দুবাসিনী সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। আমার সবচেয়ে প্রিয় স্কুল বিন্দুবাসিনী সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, কারণ টাংগাইল আমার প্রিয় শহর এখানকার উর্বর মাটি সজল প্রকৃতি উদার নীল আকাশ সবটাই মনে হতো আমার আর মা বাবা ভাইবোনদের সাথে একসাথে বসবাস করতে পারছি।

ঢাকার স্কুল দালান বাড়ি প্রায় গাছপালা শূন্য ছিল, আর এটি ছিল বিরাট বিশাল টিনের ঘর সবুজ মাঠ চারপাশ জুড়ে প্রচুর গাছপালা সামনে মৌসুমি ফুলের বাগান। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ছিল না। বড়বড় দরজা জানালা দিয়ে বাতাস চলাচল করতো, আমরা গরম অনুভব করতাম না। শুধু প্রধান শিক্ষকের কক্ষে লাল শালু কাপড়ের ঝালরওয়ালা বড় পাখা ছিল, যা বাইরে বসে বালক বয়সের একজন দড়ি দিয়ে টানতো।

প্রথম যেদিন বাবার হাত ধরে স্কুলে ভর্তি হতে যাই, সেদিন থেকেই হেডমাস্টারের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জন্মায়। শাহজাদী আপা, ছায়াদি, মনোয়ারা আপা বাংলা পড়াতেন জবাদি ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র ও ইতিহাস পড়াতেন আরতিদি, ভূগোল পড়াতেন বেবী আপা, অঙ্ক খুব ভয়  পেলেও অঙ্কের সুদর্শন শিক্ষক নজরুল স্যারকে ভালো লাগতো।

অঙ্ক বাদে আর সব বিষয়ই আমার প্রিয় ছিল। আরবি খুব কঠিন লাগতো।

পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার পর বাবা দেখলেন তার কন্যাটি অংকে লবডঙ্কা, তখন একজন গৃহশিক্ষক নিয়োগ করলেন, মোটামুটি পাশ নম্বর পেয়ে পরের ক্লাসে উত্তীণর্ হতাম। অংক শিক্ষক জ্যামিতি, এলজেব্রার সূত্রগুলো ভালোভাবে ধরিয়ে দিতেন।

রুটিন অনুযায়ী ক্লাসের সব বিষয়ের পড়া শিখে স্কুলে যেতে হতো।

সন্ধ্যায় হ্যারিকেন জ্বালিয়ে টেবিলে পড়তে বসতাম পড়া শেষ না করে ওঠতাম না, আমার মা একটু একটু পরে এসে দেখে যেতেন আমি পড়ছি কিনা। তখনকার পড়াশোনা আর এখনকার পড়ায় বিস্তর পার্থক্য, আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছি আর আমার সন্তান পড়ছে  কিন্ডার গার্টেনে। গাদাগাদি করে বসতে হয় ওদের। খেলার সুযোগ নেই মাঠ  নেই, আমাদের এতো বইয়ের বোঝা ছিলনা ওদের উপর বাণিজ্যিকভাবেই বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।

প্রতিবার রেজাল্টের কয়েকদিন আগে থেকেই মন খুব খারাপ থাকতো, মা সাবধান করে দিতো রেজাল্ট খারাপ হলে বাড়িতে জায়গা হবে না। রেজাল্টের সময় সব ক্লাসের ছাত্রীদের মাঠে দাঁড় করিয়ে নাম ডাকতো। দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা করাটা ছিল বেদনার আর পাশ করা ছাত্রীদের সাথে নাম ডাকাটা ছিল সুখ আর আনন্দের।

ম্যাক্সিমগোর্কিমা ছাড়াও নিহাররঞ্জন সেনগুপ্ত শরত্চন্দ্র, যাযাবর, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় কতকত লেখকের বই পড়েছি। বাবা পড়তেন মাসুদরানা।