নৌকো থেকে ছিটকে পড়ে যাবার কথাটা তার স্পষ্টই মনে পড়ছে। তারপরে পানির আলোড়নের এক ধরনের শব্দ। সেটা বোধহয় তিমির লেজ নাড়ার ফলে। একটু পরে চোখের সামনে সব অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যেই একটা পিচ্ছিল পথে বিনা চেষ্টাতেই সে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। পথটাই যেন তাকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মনে হলো। কিছু দূর সে পথে এগিয়ে যেতেই একটু যেন খোলামেলা জায়গায় গিয়ে হাজির হলো সে। চারদিক হাতড়ে কোথাও বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। হাতে লাগে নরম ও পিচ্ছিল পর্দা। ধাক্কা দিলে সরে যায়। তখন তার আর বুঝতে বাকি রইল না, কী তার ভাগ্যে ঘটেছে, কোথায় সে এসে পৌঁচেছে। ভয়ে ও আতঙ্কে সে এবার অস্থির হয়ে উঠল।
বাটলি স্বীকার করল, নিশ্বাস নিতে কোনো রকম কষ্ট হয়নি তার। কিন্তু অসহ্য গরম তাকে পাগল করে তুলছিল। সে গরম রোদের গরমের মতো নয়—সিদ্ধ করা সে গরমে যেন শরীরের লোমকূপগুলোর মুখ খুলে যায়, শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে।
কিছুক্ষণের ভেতরেই সে অত্যন্ত নিস্তেজ হয়ে পড়ল এবং বুঝতে পারল, তিমির পেটের এ ভয়াবহ কারাগার থেকে নিস্তার পাবার আর কোনো উপায় নেই। এর পরে বাকি রইল নীরবে মৃত্যুবরণ। কিন্তু তারও যে উপায় নেই। নিরন্ধ্র অন্ধকার এবং সেইসঙ্গে অসহ্য গরম। তার চেয়েও ভয়াবহ নিঃশব্দতা। একেই তো নিদারুণ অন্ধকার, তাতে আবার কোথাও জীবনের কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এতেই তাকে একেবারে কাবু করে ফেলল। তারপরে কী ঘটল কিছুই তার মনে নেই।
তিমি মাছ বিপন্ন অবস্থায় আস্ত মানুষ গিলে ফেলেছে এমন নজির দু’চারটি আছে, কিন্তু সে মানুষ তিমির উদর থেকে ফিরে এসে নিজের আশ্চর্য অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছে এমন নজির এই একটিই।
(অংশবিশেষ)
লেখকের ‘ তিমির পেটে কয়েক ঘণ্টা’ (মুক্তধারা, ১৯৭৬) বই থেকে
