ধোবাউড়ায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চীনামাটির পাহাড়

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ০০:১৮

ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী ধোবাউড়া উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের পুটিমারি বাজারের পাশেই অবস্থিত সাদাসোনা নামে খ্যাত চিনামাটির পাহাড়। এর পাশেই রয়েছে আদিবাসীদের একটি বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মনসাপাড়া সেভেন্থ অ্যাডভেন্টেস মিশনারিজ স্কুল। উত্তরে রয়েছে মেঘালয় ঘেষা গারো পাহাড়। সব মিলিয়ে অপার সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি এই চিনামাটির পাহাড় ও তার আশেপাশের এলাকা। এ পাহাড়কে ঘিরেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে শতাধিক সিরামিক শিল্প কারখানা। কিন্তু অপরিকল্পিত খনন ও লুটপাটে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে সিরামিক শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল রাষ্ট্রীয় সম্পদ এই চিনামাটির পাহাড়।

বাংলাদেশ অ্যাগ্রো সিরামিক নামে একটি কোম্পানি দীর্ঘদিন যাবত্ ভেদীকুড়া মৌজায় অবস্থিত চিনামাটির এই পাহাড় থেকে মাটি উত্তোলন করে আসছে। একটি স্থান থেকে মাটি উত্তোলনের পর সৃষ্ট গর্ত সাধারণ মাটি দিয়ে ভরাট করে অন্যস্থান থেকে মাটি উত্তোলন করার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বছরের পর বছর গর্ত করে মাটি উত্তোলনের পরও সৃষ্ট গর্ত ভরাট করা হয়নি। ফলে প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটে প্রায়ই। ২০১৪ সালে সৃষ্ট গর্তের মাটি ধসে এক শ্রমিকের মৃত্যু হলে তত্কালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আনিসুজ্জমান খান সরেজমিনে পরিদর্শন করে মাটি কাটা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি একটি কমিটি গঠনও করে দেন। কিন্তু কিছুদিন বন্ধ থাকার পর সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিতে একটি প্রভাবশালী চক্র সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহায়তায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়েই ইচ্ছেমতো মাটি কেটে পাহাড়টি ধ্বংস করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ খনিজ সম্পদ ব্যুরো থেকে ৫০ হাজার  বস্তা মাটি নেওয়ার অনুমোদন এনে প্রভাবশালীদের সহায়তায় লক্ষাধিক বস্তা মাটি নিয়ে যায় স্বার্থান্বেষী চক্রটি। এতে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। বিষয়টি দেখভাল করারও যেন কেউ নেই। ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের মূল্যবান খনিজ সম্পদও উজাড় হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে পরিবেশও বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। সব মিলিয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে মূল্যবান এই চিনামাটির পাহাড়টি।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হাবিবুর রহমান হাবিব জানান, ভেদীকুড়া পাহাড় থেকে লাখ লাখ বস্তা মাটি নিয়ে যাওয়ায় পরিবেশের চরম বিপর্যয় ঘটছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষক জানান, অ্যাগ্রো বাংলাদেশ নিজেরা মাটি উত্তোলন না করে এতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ত করে এবং খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে অতিরিক্ত বস্তা মাটি নিয়ে যায়। ধোবাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ হেলাল উদ্দিন বলেন, চিনামাটির হরিলুটের কারণে বিলীন হয়ে যাচ্ছে এলাকার পর্যটন সম্ভাবনা। এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এ ব্যাপারে মেসার্স বাংলাদেশ অ্যাগ্রো সিরামিকস কোম্পানির মালিক গোলাম কিবরিয়া তপনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি কিন্তু মাটি উত্তোলনের জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক বলেন, আগে মাটি কাটার ছাড়পত্র পেলে আমাকে জানানো হতো কিন্তু এখন তারা কীভাবে মাটি উত্তোলন করছে তা জানি না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাফিকুজ্জামান জানান, মাটি উত্তোলনের বিষয়টি দেখাশোনা করার জন্য খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা রয়েছেন।

মাটি উত্তোলনের দায়িত্বে থাকা খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপরিচালক মো. মামুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, মাটি কাটার সময় আমাদের কোনো লোক থাকে না তবে ছাড়পত্র দেওয়ার পর মাটি পরিবহনের সময় আমাদের লোক বিষয়টি দেখভাল করে। তবে অতিরিক্ত মাটি নেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।