করোনা সংক্রমণে বিপর্যস্ত ভারত!

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ২১:৪৬

ভারতে টানা চার দিন ধরে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের বিশ্ব রেকর্ড হয়েছে। গতকাল রবিবারও দেশটিতে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৭০০র বেশি মানুষের। লাফিয়ে লাফিয়ে সংক্রমণ বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা উপচে পড়ছে। ভারতের বড় বড় শহরের হাসপাতালে অক্সিজেন সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানী দিল্লির একটি হাসপাতালে অক্সিজেন সংকটে শুক্রবার এক রাতেই ২৫ জন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২১ এপ্রিল মহারাষ্ট্রের নাসিক শহরের একটি সরকারি কোভিড হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ বিঘ্নিত হয়ে একসঙ্গে অন্তত ২২ জন রোগী মারা যান। ঐ হাসপাতালের সামনে একটি ট্যাংকার থেকে অক্সিজেন লিক হওয়ার জেরেই ঐ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। সে সময় আধা ঘণ্টার মতো হাসপাতালের অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ ছিল।

অক্সিজেন শেষ হতে চলেছে, রোগীদের বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেন পাঠান—সপ্তম দিনের মতো গতকালও সরকারকে এমন জরুরি বার্তা দিয়েছে দিল্লির কয়েকটি হাসপাতাল। তারা বলেছে, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, রোগীদের ছেড়ে দেওয়াও হতে পারে। ভারতের কিছু কিছু এলাকার স্বাস্থ্যসেবা খাত তাদের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। অক্সিজেনের তীব্র আকাল এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে আরো হূদয়বিদারক করে তুলেছে।

মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, তার দেশ কোভিড-১৯ মহামারির শেষপ্রান্তে আছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ভারত সরকার। গত মধ্য মার্চ থেকে ভারতে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকেই অনেক রাজ্য সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কিন্তু এ সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্বে শূন্যতা দেখা গেছে। গত কয়েক সপ্তাহে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নীরব ছিলেন। ভারতের লেখক ও মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মান্দারের মতে, নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার ঔদ্ধত্য ও অহমিকা দেখিয়েছে। তাদের সক্ষমতারও ঘাটতি রয়েছে।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী যিনি নিজেই করোনায় আক্রান্ত, তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, করোনার কারণে অক্সিজেন লেভেল কমে যায়, কিন্তু অক্সিজেনের সংকট, আইসিইউ বেডের সংকটের জন্য অনেক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এজন্য ভারত সরকারই দায়ী।

ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম    হয়েছে। করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় দিল্লির অনেক শ্মশানে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। এ কারণে লোকালয়ে গণচিতায় দাহ করা হচ্ছে অনেকের মরদেহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসুস বলেছেন, করোনা মহামারি কতটা বিধ্বংসি হতে পারে তার পূর্বাভাস হচ্ছে ভারতের পরিস্থিতি।

ভারতে হঠাত্ করে সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ জানার চেষ্টা করেছে বিবিসি। সংবাদমাধ্যমটির এক খবরে বলা হয়েছে, ভারতে যখন করোনা সংক্রমণ বাড়ছিল তখন বেশ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনেক রাজ্যেই নেতারা বড় বড় জনসভা করেছে। যদিও ক্ষমতাসীন বিজেপির ড. বিজয় চৌথাইওয়ালের মতে, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সমাবেশের কারণে উচ্চহারে সংক্রমণ বাড়েনি।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরালা ও তামিলনাড়ুতে মার্চে নির্বাচন শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এখনো দুই ধাপের ভোটগ্রহণ বাকি। পশ্চিমবঙ্গে বেশ কয়েক জন প্রার্থী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এসব এলাকায় নির্বাচনি প্রচারে ন্যূনতম সামাজিক দূরত্ব বা করোনা স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। রাজনৈতিক নেতারাও কোভিড সেফটি প্রটোকল মানেননি। ভারতের নির্বাচন কমিশন শেষ মূহূর্তে এসে নির্বাচনি সভা সমাবেশের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ দিয়েছে। কিন্তু সেটা অনেক দেরিতে। পশ্চিমবঙ্গে মার্চের পর থেকে এখন সংক্রমণ বাড়ছে। আসাম, কেরালা ও তামিলনাড়ুতেও এখন সংক্রমণ ঊর্ধমুখী।

গত বছরের শেষদিক থেকে ভারতে নতুন করোনা ভাইরাস ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়ে। এই ভ্যারিয়েন্ট উচ্চহারে সংক্রমণের জন্য দায়ী কি না, সেটা তদন্ত করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ভ্যারিয়েন্টের কারণে সংক্রমণ বাড়তে পারে। তবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসার জন্য যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ এখনো নেই।

আলজাজিরার এক খবরে বলা হয়েছে, ভারতে কোনো একটা ভুল হয়েছে। শুধু নতুন ভ্যারিয়েন্টের কারণে সংক্রমণ বেড়েছে তা নয়। সংক্রমণ যখন বাড়তে শুরু করে তখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক সমাবেশ করেছেন। কুম্ভমেলার মতো বড় ধর্মীয় সমাবেশও হয়েছে।

সংক্রমণ কেনো বেড়েছে তার চেয়ে এখন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। এজন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কাজে সমন্বয় জরুরি। টিকা প্রদান কার্যক্রম জোরালো করার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব ও অন্যান্য কোভিড প্রটোকল মানা জরুরি।