পিরিয়ডে সুরক্ষা ও সচেতনতার লক্ষ্যে কচুরিপানা থেকে তৈরি স্যানিটারি ন্যাপকিন

তিন তরুণের রিসার্জেন্স

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:১৬

নিম্ন আয়ের পরিবার কিংবা সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীর নারীরা এখনো মেন্সট্রুয়াল হাইজিং বা মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন নন। আবার অনেকে আয়-রোজগার করলেও এই বিষয়টিতে অজ্ঞতার কারণে একেবারেই মাথা ঘামান না। অথচ যথাযথ সচেতনতার অভাব তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই ভাবনা থেকেই বঞ্চিত নারীদের জন্য কম খরচে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করছে ‘রিসার্জেন্স’। কচুরিপানা ব্যবহার করে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করা হচ্ছে এই সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে। যা তৈরিতে খরচ হচ্ছে দুই থেকে তিন টাকা। আর বিক্রয় মূল্য পাঁচ টাকা। মাত্র পাঁচ টাকায় পিরিয়ডকালীন সময়ে সুরক্ষা পাবেন নারীরা। পিছিয়ে থাকা নারীদের মাঝে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ন্যাপকিন তৈরির কাজটিও করছেন সুবিধাবঞ্চিত নারীরা, এতে তাদেরও কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। ‘রিসার্জেন্স’ মূলত একটি সামাজিক উদ্যোগ, যার উদ্যোক্তা তিন তরুণ। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বন্ধু—মাশিয়াত রহমান, নাজিবা নায়লা ওয়াফা ও রাফায়েত খান এটি শুরু করেন। তারা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। নানাবিধ পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ২০২২ সালের মধ্যে ১ কোটি শরণার্থীকে কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্যানিটেশনসহ নানা সুবিধা নিশ্চিত করার ভাবনা রয়েছে সেসব পরিকল্পনায়। ‘রিসার্জেন্স’ এরমধ্যেই দুটি পাইলট প্রজেক্ট পরিচালনা করেছে, যার একটি ছিল মোহাম্মদপুরে ও অন্যটি হাজারিবাগে। গার্মেন্টস ও বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন এমন ছয় হাজার নারীর কাছ থেকে তাদের খাদ্য, বাসস্থান ও স্যানিটেশন সম্পর্কিত সমস্যার কথা শোনেন তারা। সরেজমিনে ঘুরে দেখেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করছেন এই নারীদের অনেকে। তখন থেকেই এই শ্রেণির মানুষদের উপকারে আসবে এমন কিছু করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কেনিয়ায় জেনি প্যাড নামের একটি প্রতিষ্ঠান কচুরিপানা থেকে খুবই স্বল্পমূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিন উত্পাদন করে, এই বিষয়টি রিসার্জেন্সের উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করে। তারপর তারাও স্যানিটারি ন্যাপকিন  তৈরির কাজ শুরু করেন। তবে শুরুর দিকে এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নারীদের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি লক্ষ্য করেন তারা। প্রচলিত ভুল ধারণা ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে অনেকে ন্যাপকিন ব্যবহার ও ঋতুস্রাব প্রসঙ্গে সহজে কথা বলতে চাইতেন না। ধীরে ধীরে তা দূর হয়েছে। স্থানীয়দের সহায়তা নিয়েই রিসার্জেন্সের উদ্যোক্তারা নারীদের সঙ্গে মেন্সট্রুয়াল হাইজিন সম্পর্কে কথা বলেন।

‘লেটস টক পিরিয়ডস’ নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিসার্জেন্স একটি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে, যেখানে মেন্সট্রুয়েশনের বিষয়টি নিয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণা সম্পর্কে অনেকে তাদের মতামত তুলে ধরেন। দারুণ সাড়া মেলে এই ক্যাম্পেইনে। পরে শিশুদের নিয়ে ‘আমার শরীর আমার অধিকার’ শীর্ষক এক কর্মশালা আয়োজন করা হয়, যেখানে তাদের অযাচিত স্পর্শ ও যৌন হয়রানির বিষয়টি বুঝিয়ে বলা হয়।  এছাড়া ‘মেয়ে বলতে কী বুঝো’ শীর্ষক একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাও আয়োজন করা হয়, যেটিতে ‘নারী’ শব্দটি অন্যের কাছে কেমন, তা ফুটে ওঠে ছোটদের রঙতুলিতে আঁকা বিভিন্ন ছবিতে। এছাড়া ‘দে নিড রিসার্জেন্স’ নামের আরেকটি ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা ও বাধা নিয়েও কথা বলছেন উদ্যোক্তারা। ২০১৭ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে হাল্ট প্রাইজে রিসার্জেন্স বিজয়ী হয়। গেলবছরের শেষদিকে রিসার্জেন্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিপণন কর্মকর্তা নাজিবা নায়লা ওয়াফা রিসার্জেন্সের হয়ে গ্লোবাল স্টুডেন্ট এন্টারপ্রেনার অ্যাওয়ার্ডের (জিএসই) বাংলাদেশ পর্বে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন। শিক্ষার্থীদের নেওয়া বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগকে পুরস্কৃত করা হয় মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতায়। নাজিবার এবছর ম্যাকাওয়েতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জিএসইএ অ্যাওয়ার্ডের গ্লোবাল রাউন্ডে বিভিন্ন দেশের আরও ৫৩ জন বিজয়ীর মাঝে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার কথা। রিসার্জেন্সের উদ্যোক্তারা এখন একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ করছেন। কিছুদিনের মধ্যেই এটি উন্মুক্ত করা হবে। সেখানে নারীরা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা বলবেন ও বিশেষজ্ঞরা তাদের প্রশ্নের উত্তর দেবেন। এছাড়া বিভিন্ন সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠী, বস্তিতে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষ ও ফুটপাত বা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষদের জীবনমান উন্নয়নেও কাজ করতে চান তারা।