হেফাজতের তাণ্ডব: নিহত দুইজনও মামলার আসামি!

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২১, ১৬:১৪

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের চালানো তাণ্ডবের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আব্দুল্লাহ রাতিন (১৬) ও কামাল মিয়া (৩১) নামের নিহত দুইজনকে আসামি করা হয়েছে। নিহত হওয়ার দুইদিন পর তাদের আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। নিহত আসাদুল্লাহ রাতিন সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের শফিকুল ইসলামের ছেলে ও কামাল মিয়া মজলিশপুর ইউনিয়নের বড় বাকাইল গ্রামের জালাল উদ্দিনের ছেলে। নিহত আসাদুল্লাহ রাতিন জেলা শহরের বিরাসার এলাকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। কালাম পেশায় ইজিবাইক চালক ছিলেন।

নিহতদের পরিবার ও মামলার এজাহারে বলা হয়, কামাল মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে গত ২৭ মার্চ সন্ধ্যা থেকে ২৮ মার্চ বেলা ১০টার মধ্যে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আর একদিন পর গত ২৯ মার্চ রাত ১২টা ৫৫মিনিটে রাতিন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। 

এর দুইদিন পর হেফাজতের সহিংসতার ৩১মার্চ রাতে সদর থানায় এসআই সোহরাব হোসেন বাদি হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৪৫০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পুলিশের করা এই মামলার এজাহারে ১০নম্বর আসামি হিসেবে নিহত কামাল মিয়ার নাম রয়েছে। একই মামলায় ১৫ নম্বর আসামি হিসেবে নিহত রাতিনের নাম রয়েছে। 

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ২৭ মার্চ বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে সোয়া পাঁচটা পর্যন্ত কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের সদর উপজেলার নন্দনপুর বাজার স্ট্যান্ড ও আশপাশ এলাকায় হেফাজতের কর্মী-সমর্থক ও স্থানীয় জনতা রাস্তায় টায়ার, কাঠের গুঁড়ি ও ময়লা-আবর্জনা ফেলে অগ্নিসংযোগ করে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন। তারা সরকার ও পুলিশকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে শ্লোগান দেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) রইছ উদ্দিন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোজাম্মেল হোসেন পুলিশ নিয়ে নন্দনপুর বাস-স্ট্যান্ডে পৌঁছেন। এ সময় বিক্ষোভাকারীরা (বা আসামিরা) দেশীয় অস্ত্র রামদা, বল্লম নিয়ে পুলিশকে চতুর্দিকে ঘেরাও করে ফেলেন। তাঁরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করেন। পুলিশ ও এপিবিএনের সদস্য সেখানে শটগানের ফাঁকা গুলি, সিসার গুলি ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে আসামিদের পিছু হটতে বাধ্য করেন। তখন রাস্তায় অজ্ঞাতনামা তিনজনকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পুলিশ। পরে তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

নিহত কামালের মা হোসনা বেগম বলেন, মাগরিবের নামাজের পর আমরা খবর পাই কামাল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গেলে আরেকজন জানান কামালকে কুমিল্লা নিয়ে গেছে। পরদিন ২৮ মার্চ কামালের মৃত্যুর খবর আসে। ২৯মার্চ সন্ধ্যার দিকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে লাশ আনার পর রাতের দিকে গ্রামের কবরে লাশ দাফন করা হয়। 

আসাদুল্লাহ রাতিনের বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, বিকেল চারটার দিকে মায়ের ডায়াবেটিসের ওষুধ আনতে বাইরে গিয়েছিল রাতিন। এরপর আর বাড়ি ফিরে আসেনি। খোঁজাখুজির পরে জানা যায় সুহিলপুর তিন নম্বর গ্যাসক্ষেত্র এলাকায় আসাদুল্লাহ গুলিবিদ্ধ হয়। পুলিশ তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে কুমিল্লা থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৯ মার্চ রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে রাতিন মারা যায়। 

ওই মামলার বাদি সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সোহরাব হোসেন বলেন, ‘তাদের চিনেছি বলে এজাহারে তাদের নাম উল্লেখ করেছি। মামলায় আমি ঘটনা ২৭ মার্চ দেখিয়েছি। তখন তাঁরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। পরে হয়তো তারা মারা গিয়েছেন। মারা গিয়ে থাকলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ব্যবস্থা নেবেন'।

মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর মডেল থানার এসআই জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মামলাটি তদন্ত করতে গেলে এলাকাবাসী জানিয়েছে, মামলার আসামি রাতিন মারা গেছেন। অন্যদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। বাদি মামলায় আসামিদের নাম দিয়েছেন। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র থেকে নিহতদের নাম বাদ দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে মাদরাসাছাত্রদের ওপর পুলিশের হামলার খবরে গত ২৬ থেকে ২৮মার্চ পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায় হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা। এসময় পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সিভিল সার্জনের কার্যালয়, মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়, পৌরসভা কার্যালয়, জেলা পরিষদ কার্যালয় ও ডাকবাংলো, খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানা ভবন, আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন, আলাউদ্দিন খাঁ পৌরমিলনায়তন ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বরসহ ৩৮টি সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এই ঘটনায় নিহত হয় ১৫জন।
ইত্তেফাক/এমএএম