ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৫৪

ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটকে ঘিরিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাহা শুরু হইয়াছে তাহাকে কী বলা যাইতে পারে? পশ্চিমা শক্তিগুলি পুরাতন দিনের মতো একাট্টা হইয়া দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে খারিজ করিয়া দিবার সর্বতো চেষ্টা চালাইতেছে। গত ২৩ তারিখে আইনসভার নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করিয়া দিবার পরমুহূর্ত হইতে প্রকাশ্যেই এই কর্মকাণ্ড শুরু হইয়া গিয়াছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় যাইয়া ঠেকিয়াছে যে প্রধান পরাশক্তির পক্ষ হইতে মাদুরো অথবা গুয়াইদোর মধ্যে যেকোনো একজনকে বাছিয়া লইবার জন্য দস্তুরমতো বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হইয়াছে। এই আহ্বানের মধ্যে যে একধরনের বাহুবলী মনোভাব প্রকট হইয়া আছে তাহা বলাই বাহুল্য। স্মর্তব্য, ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পালটা-জবাবের প্রাক্কালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ঠিক এইভাবেই কোনো দেশ ‘আমাদের’ সাথে না থাকিলে ‘উহাদের’ তথা সন্ত্রাসবাদীদের সাথে আছে বলিয়া ধরিয়া লওয়া হইবে বলিয়া জানাইয়া দিয়াছিলেন!

গত কয়েক বত্সরে ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতির ক্রমাবনতিই ঘটিতেছে। ২০১৪ সাল হইতে এই অবধি প্রায় তিন মিলিয়ন মানুষ দেশত্যাগ করিয়াছে। দেশটির মুদ্রা বলিতে গেলে মূল্যহীন হইয়া পড়িয়াছে। সপ্তাহতিনেক পূর্বে মাদুরো দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য শপথ লইবার পর হইতেই সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হইয়াছে। আর গুয়াইদো নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণার পর হইতে পরিস্থিতি প্রায় অরাজক হইয়া উঠিয়াছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলিতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মতানৈক্য, মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত নূতন কোনো বিষয় নহে। কিন্তু তাই বলিয়া কোনো একজন ব্যক্তি বা দলের পক্ষে দাঁড়াইয়া নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অগ্রাহ্য করিবার ঘোষণা দেওয়া কতখানি গণতান্ত্রিক? সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে নানাবিধ কথা চালু আছে। বিরোধীপক্ষ নির্বাচনটিকে সুষ্ঠু বলিয়া মান্য করেন নাই। এইসবে আপত্তি করিবার কিই-বা আছে? আপত্তির প্রশ্নটি সামনে চলিয়া আসে শক্তিমান পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষপাতমূলক অবস্থান দেখিয়া। ভেনিজুয়েলায় গণতন্ত্র লইয়া ইহারা ভীষণ উদ্গ্রীব। কিন্তু সমাজে বা রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের কণামাত্র অনুশীলন হয় না এমন অনেক দেশের সঙ্গেই ইহারা বিপুল উত্সাহের সহিত নিবিড়ভাবেই সামরিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক জারি রাখিয়া চলিয়াছেন।

নয়া-ভেনিজুয়েলার নেতা হুগো শ্যাভেজের আমল হইতেই ভেনিজুয়েলাকে শায়েস্তা করিবার চেষ্টা চলিতেছে। শ্যাভেজ তেলসহ সকল খনিজ সম্পদ বহুজাতিক লুণ্ঠন হইতে বাঁচাইতে চেষ্টা করিয়াছেন। তিনি লাতিন আমেরিকাতে সাম্রাজ্যবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছেন। এই সবকিছুই শক্তিমান পক্ষগুলির বিচারে অপরাধ হিসাবে গণ্য হইয়াছে। ২০১৩ সালে তাঁহার মৃত্যুর পর হইতে মাদুরোকে সেই বোঝা বহন করিতে হইতেছে। সেই কোন অতীতে, ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তিতে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হইয়াছিল। বহিঃশক্তিগুলি ভেনিজুয়েলাতে মাদুরোকে যেইভাবে ফেলিয়া দেওয়ার চেষ্টা করিতেছে তাহার মধ্যে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে পরিগণিত এই চুক্তির প্রতি কতটুকু সম্মান প্রদর্শিত হইতেছে?