যাকাত ইসলামের মৌলিক রোকন ও প্রধান আর্থিক ইবাদত। যাকাত ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সেতুবন্ধ রচনা করে। যাকাত সম্পদ পবিত্র করাসহ অন্তরের কলুষতা দূর করে। সম্পদে বরকত হয়। যাকাতে রয়েছে মানবতার মুক্তি ও কল্যাণ। যাকাত প্রদানের নিয়মনীতি তুলে ধরেছেন এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় তিন আলেম। গ্রন্থনা :মো. আবু তালহা তারীফ
সহিহ পদ্ধতিতে যাকাত দিতে হবে
হাফেজ মাওলানা মিজানুর রহমান
সিনিয়র পেশ ইমাম, বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ
যাকাত প্রদানে শরিয়তের নিয়ম রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ হাতে থাকলে যাকাত দিতে হবে। অর্থ সম্পদ ও ব্যাবসায়িক সম্পদের যাকাত শতকরা আড়াই টাকা হারে দিতে হবে। জমিতে উত্পন্ন ফসলের যাকাত হলো—পানি সেচের প্রয়োজন না হলে ১০ শতাংশের এক এবং পানি সেচের প্রয়োজন হলে ২০ শতাংশের এক শতাংশ যাকাত দিতে হবে। স্বর্ণের নিসাব সাড়ে সাত ভরি এবং রৌপ্যের নিসাব সাড়ে বায়ান্ন ভরি। গরু ৩০টি হলে একটি বাছুর, ৪০টি ছাগলে একটি ছাগল এবং উটের নেসাব পাঁচটিতে একটি উট। অন্যদিকে মাটির তলদেশ থেকে খনিজ সম্পদ হস্তগত হলে পাঁচ শতাংশের এক শতাংশ হিসাব করে যাকাত দিতে হবে। যাকাত যে কাউকে দিলে হবে না। যাকাত প্রদানের নির্দিষ্ট খাত রয়েছে, যাকে মাসারিফুস যাকাত বলা হয়। পবিত্র কোরআনে যাকাত বণ্টনের আটটি খাতের বর্ণনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সদকা (যাকাত) কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়ের কর্মচারী, যাদের চিত্তাকর্ষণ করা প্রয়োজন তাদের জন্য এবং দাসমুক্তি,ঋণগ্রস্থ, আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী ও মুশাফিরদের জন্য। এটা মহান আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ তায়ালা সর্বজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা-৬০)
ধনীদের যাকাত গরিবের জন্য অনুগ্রহ বা দয়া নয়, এটি গরিবের অধিকার। লোক দেখানো, নিজের সম্মান কিংবা পরিচিতি পাওয়ার জন্য যাকাত দেওয়া চলবে না। যাকাতের অর্থ দিয়ে উপকার পাওয়ার লোভে বা ব্যক্তিগত কাজ করিয়ে পারিশ্রমিক দেওয়া ঠিক হবে না। আমাদের সমাজে দেখা যায়, ধনী ব্যক্তি মাইকিং করে সবাইকে একত্র করে কাপড়ের ওপর নিজের নাম লিখে কাপড় গরিবদের দান-সদকা দিয়ে থাকে। সেই ধনী ব্যক্তির যাকাত বা দান-সদকা নেওয়ার জন্য অনেক গরিব অসহায় মানুষ দীর্ঘ লাইনের মধ্যে দাঁড়িয়ে অনেক কষ্ট ক্লেশ করে। দান-সদকা এভাবে দেওয়া ঠিক নয়। নিজের দান নিজে গরিব আসহায় ব্যক্তির নিকট গিয়ে দেওয়া উত্তম।
মাদকাসক্তি নির্মূল ও সামাজিক উন্নয়নে যাকাত দিন
মাওলানা মীর মো. হাবিবুর রহমান যুক্তিবাদী
খ্যাতিমান ওয়ায়েজিন ও ইসলামি চিন্তাবিদ
মাদকাসক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো সঠিকভাবে যাকাত বণ্টন না করা। এক জন অসহায় ছেলে কর্মসংস্থান না পেয়ে বেকার-ভবঘুরে হয়ে এলাকার বিভিন্ন ছেলেদের সঙ্গে চলাফেরা করে। সে প্রথমতো প্রবেশ করে ধূমপানে, এরপর এক এক করে বিভিন্ন নেশায় আসক্ত হয়। তারপর শুরু করে মাদক বিক্রি। মাদক বিক্রি করে ভালো লাভবান হয়, তাই মাদক বিক্রি করা তার পেশাও হয়ে যায়। সে সমাজে পরিচিত হয় নেশাগ্রস্ত একটি ছেলে হিসেবে, ঘৃণা করে সমাজের সবাই। কিন্তু মাদকের পথে প্রবেশের কারণ আমরা কি কেউ একবার ভেবে দেখেছি? যখন ছেলেটি অসহায় ছিল তখন আমরা সমাজের উচ্চব্যক্তিরা ছেলেটির পাশে দাঁড়াইনি। বেকার এই অসহায় ছেলেটির কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেইনি। আমরা যদি আমার যাকাতের টাকার কিছু অংশ অসহায় গরিব-বেকার ছেলেটিকে দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতাম তাহলে একদিন এই ছেলেটি ব্যবসা করে অন্যদের যাকাত দিত। এভাবে বেকারত্ব দূর হয়ে সমাজের উন্নয়ন হতো। আমাদের সমাজে যাদের যাকাত ফরজ হয়েছে সবার কিছু কিছু টাকা মিলিয়ে নিজ এলাকার অসহায়দের ঘর তৈরি, কারেন্ট বা নলকূপ এনে দিয়ে আমরা তাকে সাহায্য করতে পারি। বিধবা মহিলাকে সেলাই কাজ শেখাতে টাকা বা সেলাই মেশিন কিনে দিয়ে তার সাংসারিক উপকার করতে পারি। এক শিক্ষার্থী টাকার অভাবে শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না। সে বই কিনতে কিংবা পরীক্ষার বিভিন্ন ফি আদায় করতে পারছে না। আমরা তাকে যাকাতের টাকা দিয়ে তার লেখাপড়ায় সাহায্য করতে পারি। এভাবে যাকাত আদায়ে অসহায় ব্যক্তি সচল হয়। ভিক্ষাবৃত্তি উচ্ছেদ হয়। সমাজ উন্নত হয়।
কৃপণতা নয়, সম্পদ পবিত্র করতে যাকাত দেব
আ খ ম আবু বকর সিদ্দিক
অধ্যক্ষ, দারুন্নাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদ্রাসা
সম্পদ পবিত্রকরণে যাকাতের বিকল্প নেই। যাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা। স্বীয় মালিকানাধীন সম্পত্তি থেকে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট অংশ শরিয়তের নির্দেশানুপাতে বের করে দেয়াকে যাকাত বলা হয়। আল্লাহপাক নামাজের সঙ্গে পবিত্র কোরআনে যাকাত দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আমাদের উচিত অসহায় ব্যক্তির অসহায়ের হাতকে ভরপুর করে দিয়ে নিজের অন্তরের কৃপণতা দূর করা। ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। আপনার সম্পত্তির মধ্যে গরিব-দুঃখীর হক রয়েছে, সেই হক আদায় করুন। এই সম্পদ আমার নয়, আল্লাহর। ব্যাংকে টাকা রাখলে সেই টাকা ব্যাংক মালিকের হয় না। তেমনি আল্লাহর দেওয়া সম্পদ আমাদের নয়, গচ্ছিত মাত্র। আল্লাহ যে কোনো সময় নিয়ে যেতে পারেন। আমার নিকট গচ্ছিত সব সম্পদের মালিক আল্লাহ। আল্লাহর সম্পদ আল্লাহর বান্দাদের দিচ্ছি। কৃপণতার প্রশ্নই আসে না। হিসাব করে যাকাত দেব। নিজ সম্পদ পবিত্র করব।
