পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন

হারলেও শক্ত ভিত পেয়েছে বিজেপি!

আপডেট : ০২ মে ২০২১, ২১:৫১

তালেব রানা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বড় জয় পাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস। গতকাল রবিবার বিকাল পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলের যে ট্রেন্ড ছিল তাতে ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল—বিপুল ব্যবধানে জিতে টানা তৃতীয় বারের মতো আবারও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসছে তৃণমূল। আর এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই ভোট গণনা হয়েছে দেশের আরো চারটি রাজ্যে—তামিলনাড়ু, কেরালা, পন্ডিচেরি ও আসামেও। কিন্তু সর্বভারতীয় স্তরেও গণমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। কারণ এবারের নির্বাচনে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বনাম প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি! গত প্রায় দুই মাস ম্যারাথন ভোটগ্রহণ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এ সময়ে পায়ে আঘাত পেয়ে হুইলচেয়ারে ঘুরে প্রচারণা চালান মুখ্যমন্ত্রী মমতা। অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি সব মিলিয়ে ২৫ থেকে ৩০টির মতো নির্বাচনি সভা করেছেন পশ্চিমবঙ্গে। শেষ দিকে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় তিনি সশরীরে পশ্চিমবঙ্গে প্রচারণা চালাতে পারেননি। মোদি ছাড়াও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডাও পশ্চিমবঙ্গে প্রচারণা চালিয়েছেন। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও প্রচারণায় যোগ দেন। সব মিলিয়ে এবার বিজেপির শীর্ষ নেতাদের টার্গেটই ছিল পশ্চিমবঙ্গ। মমতা ব্যানার্জি বনাম নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জুটির জনসভা আর রোড শোগুলো যেভাবে জাতীয় চ্যানেলগুলোতে জায়গা পেয়েছে, তার তুলনাও বিরল।

এবার মমতাকে সরিয়ে সরকার গড়তে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছেন বিজেপি নেতারা। কিন্তু ফলাফল বলছে বিজেপির সব চেষ্টায় ব্যর্থ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেতে চলেছে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল আর বিজেপির আসন সংখ্যা ১০০ ছাড়াচ্ছে না।

ভারতে টানা দুই বার বিজেপির ক্ষমতায় আসার জন্য নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটিকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তাদের নেতৃত্বে উত্তর প্রদেশ, আসাম, বিহারে সরকার গড়েছে বিজেপি ও দলটির শরিকরা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই দুই নেতার প্রভাব ও কারিশমা সফল হয়নি। এনডিটিভির এক খবরে গতকাল বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিতেছেন মমতা ব্যানার্জি। এই নির্বাচনের ফলাফলে ব্যাপকভাবে হতাশ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন অমিত শাহ।

এই পশ্চিমবঙ্গ তিন দশক বামদের ঘাঁটি ছিল। সেই বামদের সরিয়ে পরপর দুই বার ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। এবার বিজেপিকে হারিয়ে তৃতীয় বারের মতো ক্ষমতায় আসছে দলটি। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২১১টি বিধানসভা আসনে জয়লাভ করেছিল। বিরোধী সিপিএম, জাতীয় কংগ্রেস জোট পায় ৭৬টি আসন আর বিজেপি পেয়েছিল মাত্র তিনটি আসন। কিন্তু ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সামনের সারিতে চলে আসে বিজেপি। ৪২ লোকসভা আসনের মধ্যে তারা পায় ১৮ আসন। এই সাফল্যের ওপর ভর করে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়তে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করে বিজেপি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সফল হতে পারেনি। প্রধান বিরোধী দল হয়েই তাদের থাকতে হচ্ছে।

নির্বাচনি বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দ্বিমুখী লড়াই হয়েছে। যে লড়াইয়ে এক দিকে ছিল মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস অন্যদিকে বিজেপি, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। লড়াইটা দ্বিমুখী হওয়ার কারণে এবারের নির্বাচনে বিরোধী দল সিপিএম ও কংগ্রেসের অস্তিত্ব বলা চলে মুছে গেছে। মোদি-অমিত ঝড়ে মমতার দলের তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও বলা চলে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বাম ও জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে জয় না পেলেও বড় ভিত্তি পেয়েছে বিজেপি। গত বারের বিধানসভা নির্বাচনে তারা মাত্র তিনটি আসন পেয়েছিল। এবার তারা ৮০ থেকে ৮৫টি আসন পাচ্ছে। তারা প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসছে। যেখানে কিছুদিন আগেও তাদের দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না সেখানে তারা শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। এ নির্বাচনে এটাই হতে পারে বিজেপির সবচেয়ে বড় অর্জন। কারণ হিন্দি ভাষাভাষি রাজ্যগুলো থেকে পশ্চিমবঙ্গ সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশভাগ ও স্বাধীনতার পরবর্তী সাত দশকে পশ্চিমবঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা যে হয়নি তা নয়। কিন্তু মোটের ওপর এই রাজ্য ভারতে হিন্দু-মুসলিমের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্যই পরিচিত। সেখানে ডানপন্থি ও হিন্দুত্ববাদী শক্তি বিজেপি এক ধাক্কায় সরকার গড়বে সেটা আশা করাও কঠিন।