ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে চিংড়ি রপ্তানি। বাংলাদেশ থেকে এক সময় প্রচুর চিংড়ি রপ্তানি হত। এখন দেশে উত্পাদন অনেক কমে যাওয়ায় রপ্তানিও কমেছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা। তারা বলছেন, প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে চিংড়ির উত্পাদন কমছে। অন্যদিকে তুলনামূলক কম দামের এবং বেশি উত্পাদনশীল ভেন্নামী প্রজাতির চিংড়ি চাষের অনুমোদন না থাকায় উত্পাদনকারী ও রপ্তানিকারকরা লোকসানে পড়ছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ প্রজাতির চিংড়ি চাষের অনুমোদন দিতে সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ প্রজাতির চিংড়ি উত্পাদন শুরু হলে দেশ লাভবান হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চিংড়ি রপ্তানি করে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্ব) ২২ কোটি ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে যা ১৭ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান দেখলে দেখা যায়, ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি আয় কমছে এ খাতে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৬৩৫ মেট্রিক টন চিংড়ি রপ্তানি হয়। ওই অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৫৫ কোটি ডলার। পরের দুই অর্থবছরে তা যথাক্রমে ৫০ কোটি ৯৭ লাখ ডলার ও ৪৭ কোটি ২৩ লাখ ডলারে নেমে আসে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি হয় ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আর গত অর্থবছরে (২০১৭-১৮) ৩৬ হাজার ১৬৮ টন চিংড়ি রপ্তানি করে আয় হয় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। অর্থাত্ গত পাঁচ বছরে রপ্তানি প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে। এদিকে বাংলাদেশ থেকে যত জীবিত ও হিমায়িত মাছ রপ্তানি হয়, তার ৮৫ শতাংশ চিংড়ি। আর চিংড়ি রপ্তানি কমে যাওয়ায় মাছ রপ্তানি আয়ে মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) তথ্যে দেখা গেছে, দেশে প্রায় পৌনে তিন লাখ হেক্টর জমিতে চিংড়ির চাষাবাদ হয়। যেখানে বছরে ২ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি উত্পাদিত হয়। চিংড়ি ও মাছ প্রক্রিয়াকরণের জন্য সারা দেশে ১০৮টি কারখানা আছে। বাংলাদেশ থেকে হিমায়িত ও জীবিত মাছ ৬০টি দেশে রপ্তানি হয়। এসব দেশে বছরে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার টন চিংড়ি রপ্তানি হয়।
চিংড়ি চাষী ও রপ্তানিকারকদের দীর্ঘদিনের দাবি দেশে যাতে ভেন্নামী প্রজাতির চিংড়ি চাষের অনুমোদন দেওয়া হয়। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সভা সেমিনারও হয়েছে। পরে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে চলতি বছর থেকে খুলনা ও চট্টগ্রামে পাইলট ভিত্তিতে ভেন্নামি চাষ করা হবে। ফলাফল ভালো পাওয়া গেছে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষের অনুমোদন দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সভাপতি মো. আমিন উল্লাহ্ চিংড়ি রপ্তানি বিষয়ে ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমানে দেশে চিংড়ির উত্পাদন অনেক কম হচ্ছে। ফলে ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে রপ্তানিও। দেশে এখন প্রাকৃতিকভাবে চিংড়ি উত্পাদিত হচ্ছে। উত্পাদন বাড়াতে হলে আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করতে হবে। তাহলে অল্প জায়গায় বেশি চিংড়ি উত্পাদন হবে।
বিএফএফইএ’র সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী বেলায়েত হোসেন বলেন, বিশ্বব্যাপী যত চিংড়ি রপ্তানি হয় তার ৭৭ শতাংশ ভেন্নামী প্রজাতির। চিংড়ি রপ্তানি বাড়াতে এ প্রজাতির চিংড়ি উত্পাদনের বিকল্প নেই।
বিএফএফইএ’র পরিচালক শেখ কামরুল আলম বলেন, দেশ থেকে ৭০ শতাংশ চিংড়ি ইউরোপে রপ্তানি হয়। আর ২০ ভাগ রপ্তানি হয় আমেরিকায়। বাকী অংশ রপ্তানি হয় অন্যান্য দেশে। তিনি বলেন, যেসব দেশ ভেন্নামী প্রজাতির চিংড়ি উত্পাদন করে তারা অল্প দামে রপ্তানি করতে পারে। ফলে তাদের থেকে চিংড়ি কেনে বিদেশিরা।
