করোনা মহামারি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় বিপর্যয় ডাকিয়া আনিয়াছে। করোনা বিদায় লইলেও বিশ্ববাসী কতদিনে এই অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটাইয়া উঠিবেন তাহা কেহ নিশ্চিত করিয়া বলিতে পারিতেছেন না। সংক্রমণ ব্যাধি করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও ‘লকডাউন’ দেওয়া হইয়াছে; কিন্তু এই লকডাউনের প্রভাবে অর্থনীতিতে নামিয়া আসিতেছে ধস। লকডাউনে সরকারি অফিস বন্ধ থাকায় ব্যবসায়-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। কেননা ব্যবসায়-বাণিজ্যের অনেক কিছুই সরকারি দপ্তরসমূহের সহিত সংশ্লিষ্ট। লকডাউনের কারণে পণ্য পরিবহনব্যবস্থাও ভীষণভাবে ক্ষতির কবলে পড়িয়াছে। গতকাল ইত্তেফাকের একটি খবরে বলা হইয়াছে, খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার চাষিরা হাজার হাজার তরমুজ তুলিয়া খেতে ফেলিয়া রাখিয়াছেন। তাহারা ব্যাপারীদের আগমনের প্রত্যাশায় রহিয়াছেন; কিন্তু লকডাউনের কারণে স্বাভাবিক ও সামগ্রিক পরিবহনব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় তাহারা আসিতে পারিতেছেন না। ফলে খেতের ফসল খেতেই বিনষ্ট হইবার উপক্রম হইয়াছে। যদিও পণ্যবাহী যানবাহন লকডাউনের আওতামুক্ত, তথাপি বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যস্বত্বভোগীরা যথাসময়ে যোগাযোগ করিতে পারিতেছেন না। ফলে লকডাউন আমাদের কৃষি অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হিসাবে দেখা দিয়াছে।
গত মাসের শুরুতে যখন সমগ্র দেশে লকডাউন তথা কঠোর বিধিনিষেধ জারি করা হয়, তখন ১১টি নির্দেশনার প্রথম দফায় বলা হয়, সকল প্রকার গণপরিবহন বন্ধ থাকিবে। ইহাতে পণ্য পরিবহন, উত্পাদনব্যবস্থা ও জরুরি সেবাদান চালু থাকিবার কথা বলা হইলেও গণপরিবহন বন্ধ থাকায় কৃষি উত্পাদন ও বাজারজাতের সহিত জড়িত অনেক ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করিতে পারিতেছেন না। ধান কাটিবার সময় কৃষিশ্রমিকরা যাহাতে সর্বত্র যাতায়াত করিতে পারেন এই জন্য পাশের ব্যবস্থা করা হয়; কিন্তু পণ্য পরিবহনের সহিত জড়িত সকলের জন্য এই ব্যবস্থা অবারিত নহে। কোনো ফসলের বাম্পার ফলন হইলেও তাহা যদি সঠিক সময়ে বাজারজাত করা না যায়, তাহা হইলে উত্পাদক শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হইবেন নিঃসন্দেহে। আমাদের জানামতে, এই বত্সর পটুয়াখালীতেও তরমুজের বাম্পার ফলন হইয়াছে; কিন্তু লকডাউনে একদিকে বিক্রয় কমিয়া গিয়াছে, অন্যদিকে পরিবহন খরচ বাড়িয়া যাওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পড়িয়াছেন লোকসানের মুখে। এই জন্য তাহাদের দাবি, লকডাউনের কারণে যেন পণ্য পরিবহনে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয়। লকডাউনে পণ্য পরিবহন খরচ কেমন বাড়িয়াছে তাহার একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। পূর্বে পটুয়াখালী হইতে এক ট্রাক তরমুজ ঢাকায় পাঠাইতে খরচ হইত ১৫ হইতে ১৮ হাজার টাকা। এখন সেইখানে খরচ হইতেছে ২৪-২৫ হাজার টাকা। ফলে বাজারে ইহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে।
খেতে এখনো যেই পরিমাণ তরমুজ রহিয়াছে তাহা যেন দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো যায়, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ লইতে হইবে। এই পরিস্থিতিতে কেহ কেহ সরকারি ব্যবস্থাপনায় তরমুজ পরিবহন এমনকি বিক্রয়ের দাবিও জানাইয়াছেন। আমরা জানি, গত বত্সর লকডাউনের সময় বিশেষ পার্শেল ট্রেন চালু করা হইয়াছিল। আম পরিবহনের জন্য ঢাকা-উত্তরবঙ্গের পথে চালু করা হইয়াছিল ‘ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন’। করোনাকালে ঈদুল আজহার সময় চালু করা হইয়াছিল কোরবানির পশুবাহী ‘ক্যাটেল ট্রেন’। অনুরূপভাবে তরমুজচাষিদের হতাশা দূর করিতে ‘ওয়াটারমিলন ট্রেন’ চালু করিবার কথাও চিন্তা করা যায়। অবশ্য কৃষিপণ্য পরিবহনে ইতিমধ্যে চার জোড়া বিশেষ পার্শেল ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত লইয়াছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এই সকল ট্রেনে শাকসবজি, ফলমূল ও জরুরি প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন করা হইবে। এই সকল পণ্য পরিবহনে মূল ভাড়ার উপর দেওয়া হইবে ২৫ শতাংশ ছাড়। ইহাছাড়া বাড়তি কোনো মাশুল দিতে হইবে না। তরমুজচাষি ও ব্যবসায়ীরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে পারেন।
