পাখিসব করে রব

আপডেট : ০৬ মে ২০২১, ২১:৩১

প্রণব মজুমদার

ওয়ার্সি পাখি খুব ভালোবাসে! কিছুদিন আগে সে আম্মু, বড়ো আপু ও দুলাভাইয়ের সঙ্গে গেল কাটাবন। খাঁচাসহ দুইটি লাভ বার্ড কিনে আনলো বাসায়। আম্মু পাখিদের জন্য দু’ মাসের খাবার কিনে নেন। সিএনজি করে বাসায় ফেরার সময় দুলাভাই বললেন—

—এবার খুশি তো ওয়ার্সি?

চশমাটা টিস্যু পেপারে মুছতে মুছতে মাথা নাড়ে সে। আনন্দে ভাবে লার্ভ বার্ডদের ঘর নিয়ে। পাখি দু’টি দেখে মেজ আপু অর্থিও বেশ খুশি! সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের পাশে সাততলা ভবনের ছ’তলায় থাকে ওরা। ওদের ভাড়া বাসাটা বেশ খোলামেলা। আলো-বাতাসে পূর্ণ। বারান্দায় তারে ঝোলানো খাঁচায় প্রায় সময় শস্যদানা ও পানি দেয় ওয়ার্সি ও মেজ আপু।

মন্দিরের নবনির্মিত তিনতলা খোলা ছাদে কাক ও কবুতরের বিশাল আধিপত্য! কা-কা ও বাকবাকুম শব্দে ভোরের ঘুম ভাঙে আম্মুর। ছোট মেয়ের মতো হাওয়া বিবি চম্পার পাখিপ্রীতি। কাক ও কবুতরকে তিনি বারান্দার কার্নিশে ওদের পছন্দের খাবার দেন। সৌদি আরব থেকে স্বামীর পাঠানো খেজুর ও জমজমের পানি একাধিকবার পাখিদেরও দিয়েছেন। শাহজাহান মিয়া সেখানে চাকরি করেন। পাখিদের জন্য লোক মারফত খাবারও পাঠান তিনি। বাসার কাছেই নামকরা মেয়েদের বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে ওয়ার্সি। করোনা অতিমারির কারণে ক্লাস বন্ধ থাকায় বিদ্যালয়ে যেতে হয় না তারও। অনলাইনে পড়াশোনা। ওয়ার্সি তাই পাখিদের পরিচর্যা করার অনেক সময় পায়। আম্মু ছাদে নানা গাছ লাগিয়েছেন। ভোর ও সন্ধ্যায় তার যত্ন করেন। মাঝে মাঝে বিকেলে মায়ের সঙ্গে লাভ বার্ডদের ছাদে নিয়ে যায় ওয়ার্সি।

মগবাজারে ওয়ার্সির বড়ো মামার নিজস্ব বিশাল ফ্ল্যাট। সেখানে নানু থাকেন। সত্তরোর্ধ্ব বয়স্ক নানুর নানা রোগ। ক’দিন ধরে তিনি অসুস্থ। আম্মুকে ফোনে জানিয়েছেন মামা। বাসায় তালা মেরে ক’দিনের জন্য ওরা সবাই নানুকে দেখতে চলে যায়। ফিরে আসে আটদিন পর। আম্মু তালা খুলতেই ওয়ার্সি ও অর্থি বারান্দায় দেয় দৌড়। দুর্গন্ধময়! চিত্কার করে ওঠে ওয়ার্সি!

—লাভ বার্ড দু’টিই খাঁচায় শুয়ে আছে, আম্মু!

অর্থি তার কলেজ থেকে আনা লাঠিটা আনে। পাখি দুটোকে এদিক ওদিক করে সে দেখে—তারা নড়াচড়া করছে না। বড়ো বড়ো চোখ করে তাকালেন আম্মু। বললেন—ওরা বেঁচে নেই!

ওয়ার্সির মন খারাপ লাভ বার্ডদের জন্য। খাঁচাটা ফাঁকা। মন খারাপের দিনগুলো কাটে তার বারান্দার গ্রিল ধরে তাকিয়ে। আম্মু লক্ষ করেন, কবুতরের আনাগোনা মন্দিরের ছাদে আগের মতো নেই।

—ব্যাপারটা কী রে অর্থি? কবুতরগুলোকে দেখছি না  কেন? গেল কই?

—ধর্মঘট করেছে, আম্মু!

ওয়ার্সি বলল।

—না আম্মু! ছাদের আংকেল ওদের বেচে দিয়েছে! নানুকে দেখতে যাওয়ার আগে এক সকালে অর্থি মন্দিরের ছাদে দেখে কাকদের সমাবেশ। সে ছাদে পোষা ৩৫টি কবুতরের মধ্যে ২৭টি বাকবাকুম করছে। পাত্রে রাখা পানি খাচ্ছে কেউ। কেউ খাচ্ছে গম। আর কয়েকটা পেখম মেলছে! অর্থির মনে হলো সহাবস্থানের জন্য কাক ও কবুতরদের জরুরি সভা। কবুতরগুলো ছাদে অবস্থান নেওয়ার পর কাকদের আধিপত্য একেবারে কমে গেছে! মেজ আপুর কথা শুনছিল ওয়ার্সিও। আম্মুকে বলল ওয়ার্সি—আমাদের ছাদের কার্নিশে পোষা দু’টি কবুতর বাসা বেঁধেছিল। কাকরা তা ফেলে দিয়েছে ক’দিন পর, আম্মু। আমি দেখেছি।

অর্থির উত্তর—কেন জানো?

কৌতূহলী আম্মু অর্থির দিকে চোখ ফেরান।

—কেন বল?

—ক্ষমতার লড়াই।

দু’দিন পর কবুতর ফিরে এল ছাদে। ঢুকল খোয়াড়ে।

এবার আম্মু বললেন—ওরা মনে হয় গোপন বৈঠক করতে গা ঢাকা দিয়েছিল।

সঙ্গে সঙ্গে অর্থির উত্তর—পাখিসব আমদের মতো না! স্বার্থপর না ওরা! হিংসুেট না! ওরা মিলেমিশে থাকে।

মেজ আপুর শক্ত কথা শুনে ওয়ার্সি মাথা নাড়ে। আর বলে—ঠিক বলেছো আপু! পাখিরা মানুষকেও ভালোবাসে।