গ্যালিলিও গ্যালিলি

আপডেট : ০৮ মে ২০২১, ২১:০৩

মাধব রায়

কথাসাহিত্যিক, সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান)

ব্লু বার্ড হাইস্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট

বাবা মা ছেলেকে ডাক্তারি ছেড়ে গণিত পড়তে অনুমতি দেবেন! যেখানে ডাক্তারি পড়া শেষ হলে আয় রোজগারের আর কোনও চিন্তাই নেই। তাঁরা বললেন-পাগলামি পেয়েছিস। কিন্তু গ্যালিলিও ডাক্তারি পড়া ছেড়েই দিলেন। অংক নিয়ে মেতে রইলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানে পারদর্শী হয়ে উঠলেন। ১৫৮৫ সালে কোনও ধরনের ডিগ্রি ছাড়াই পিসা বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে ফ্লোরেন্স ফিরে গেলেন তিনি। সেখানে ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেট পড়িয়ে কিছুটা আয় রোজগারের চেষ্টা করলেন।

সরল দোলকের সূত্র কখন আবিষ্কার করলেন?

সেই পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই একদিন গির্জার ঝাড়বাতির লণ্ঠনের দুলুনি দেখে গবেষণা করলেন। ১৫৮৯ সালে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে যোগ দিলেন গ্যালিলিও। তাঁর পদের নাম ছিল চেয়ার অব ম্যাথমেটিকস, বেতন ৭২০ ক্রাউন। আবার একই পদে ডাক্তারি পড়িয়ে একজন অধ্যাপক পেতেন ২০০০ ক্রাউন।

এত পার্থক্য কেন? কমলা বললেন।

পার্থক্য কারণ মানুষ অংকের চেয়ে ডাক্তারিকে বেশি গুরুত্ব দিত। বাধ্য হয়ে সংসার চালানোর জন্য প্রাইভেট টিউশনি করতেন গ্যালিলিও। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময় অ্যারিস্টটলের বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখতেন গ্যালিলিও।

অ্যারিস্টটলের বিরোধিতা কেন? গ্যালিলিও অ্যারিস্টটলকে শ্রদ্ধা করতেন না? বলল চন্দ্রা।

না, না, শ্রদ্ধা করতেন না- বিষয়টা এরকম নয়। বিরোধিতা করা মানে অশ্রদ্ধা করা নয়।

তা কোন বিষয়ে বিরোধিতা করতেন?

অনেক বিষয়ে। যেমন, অ্যারিস্টটল দুই ধরনের গতির কথা বলতেন। প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক। প্রাকৃতিক গতিতে বস্তু উপরে-নিচে অথবা নিচে-উপরে গতিশীল। যেমন ধোয়া উপর দিকে উঠে আর কোনও বস্তু উপর থেকে ছেড়ে দিলে নিচে নেমে যায়। অ্যারিস্টটলের মতে আকাশের তারাগুলোর গতিপথও প্রাকৃতিক, তবে পৃথিবী থেকে ভিন্ন। আর অপ্রাকৃতিক গতিতে গতিশীল বস্তু সমান্তরালে গতিপ্রাপ্ত হয়। যেমন মার্বেলের গতি। কিন্তু গ্যালিলিও বললেন, শুধু জড়তাজনিত গতি ছাড়া বাকি সব গতির কারণ হচ্ছে বল।

অ্যারিস্টটল আরও বলেছিলেন, বিভিন্ন ওজনের বস্তু একসাথে ছাড়া হলে তা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নিচে নেমে আসে। গ্যালিলিও এই কথার বিরোধিতা করে বলেন-আমি নিজে দেখেছি, শিলাবৃষ্টির সময় বিভিন্ন ওজনের এবং বিভিন্ন আকৃতির শিলা একই সময়ে মাটিতে এসে পড়ে।

অণু বলল-ঠিকই তো, শিলা পড়ার সময় তো ছোট বড় সবগুলোই একসাথে পড়ে।

কিন্তু গ্যালিলিওর বিরোধীরা এবং অ্যারিস্টটলপন্থিরা বললেন-ভারি শিলাগুলো মেঘের উঁচু স্থান থেকে আর হালকা শিলাগুলো নিচু স্থান থেকে পড়ে বলে একসাথে এসে পড়ে।

সবাই হাসল। বিরোধীদের এই যুক্তি তাদের কাছে কুযুক্তি মনে হলো।

নীলকান্তবাবু বললেন-গ্যালিলিও কিন্তু এতে দমলেন না। বিভিন্ন ওজনের কামানের গোলা নিয়ে পিসার হেলানো টাওয়ারে উঠে একসাথে ফেলতে থাকলেন। অনেক লোকজন এবং ছাত্রদের সামনে তিনি দেখালেন সবগুলো একসাথেই মাটিতে এসে পড়ে।

এছাড়া অ্যারিস্টটলের অন্যান্য মতবাদেরও বিরোধিতা করেছিলেন গ্যালিলিও। আকাশে চাঁদের সীমা ছাড়িয়ে যে গোলকটি রয়েছে সেটি নিখুঁত এবং অপরিবর্তনশীল। সূর্য, গ্রহ এবং অন্যান্য সবকিছু একটা স্বচ্ছ গোলকের ভেতর সুবিন্যস্তভাবে সাজানো রয়েছে এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একেবারে কেন্দ্রস্থলে রয়েছে পৃথিবী। চন্দ্র-সূর্য-তারা সংঘবদ্ধ হয়ে একটা স্বচ্ছ গোলকের ভেতর পৃথিবীকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে। বলতেন অ্যারিস্টটল।

গ্যালিলিও বললেন-না, পৃথিবী সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু নয়। সূর্যকে কেন্দ্র করে ওগুলো ঘুরছে। ফলে অ্যারিস্টটলপন্থিরা গ্যালিলিওর ওপর ক্ষেপে যায়। তাঁর বিরোধীপক্ষ ছিল শক্তিশালী। তিনি পিসা ছেড়ে পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হয়ে চলে যান ১৫৯২ সালে। পাদুয়া ছিল ভেনিসের একটা অংশ। ভেনিস হলো ইটালির ধনী এবং শক্তিশালী একটা রাজ্য। ভেনিস থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে পাদুয়া। সেখানে একটানা ১৮ বছর অধ্যাপনা করেন তিনি। কিন্তু পিসায় আসার জন্য তাঁর অন্তর ছটফট করত। ১৬১০ সালে তিনি আবার পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের প্রধান অধ্যাপক হয়ে আসেন। সেই সঙ্গে পিসার ডিউককে অংক ও দর্শন শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। কিন্তু কোপার্নিকাসের মতবাদ সমর্থন করায় আবার তাকে গঞ্জনা সহ্য করতে হয়।

কোপার্নিকাসের মতবাদ কোনটি?

ওই যে, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবী-চাঁদ, অন্যান্য গ্রহ সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এটি বলেছিলেন কোপার্নিকাস। এই কথা তো অ্যারিস্টটলের বিপরীত। ফলে টানা তিন বছরের চুক্তিতে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করলেও মেয়াদ শেষ হবার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর ওপর বিতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে এবং চুক্তি আর নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন অবশ্য আবার গ্যালিলিও পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফিরে আসেন।

কিন্তু গ্যালিলিও কী কী আবিষ্কার করেন, সেটি বলো, বলল অণু।

গ্যালিলিওর আবিষ্কারের মধ্যে একটি হলো হাইড্রোস্ট্যাটিক ব্যালেন্স। এটি তাকে বিখ্যাত করে তোলে। তিনি বলেন প্রত্যেক পদার্থেরই একটা ভরকেন্দ্র আছে, যা এর গতির হিসাব করতে সাহায্য করে। এই তত্ত্বটিও তিনিই আবিষ্কার করেন।

তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য তিনি থার্মোমিটার তৈরির চেষ্টা করেন এবং নলের মধ্যে পানি ব্যবহার করেন। তাঁর তৈরি থার্মোমিটার ফলপ্রসু হয়নি। তবে পরবর্তীতে পারদ থার্মোমিটার তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছিল। পাদুয়ায় থাকাকালীন ১৫৯৫ বা ১৫৯৬ সালে প্রপরশনাল কম্পাস নামে একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এই যন্ত্র অংকের ক্ষেত্রে ব্যবহূত হতো। কোনও সংখ্যার বর্গমূল নির্ণয় করতে এই যন্ত্র ব্যবহূত হতো।