মালদ্বীপে রাজনৈতিক সংকট

নাশিদকে হত্যার চেষ্টা করল কারা?

আপডেট : ০৯ মে ২০২১, ২১:৪৩

শিফারুল শেখ

রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য পরিচিত মালদ্বীপ। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে সেই খবর খুব একটা সামনে আসেনি। করোনার বিস্তার রোধে বুধবার রাত থেকে সেখানে কারফিউ জারি করা হয়। আর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়ির কাছে বিস্ফোরণে আহত হন দেশটির জনপ্রিয় এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ। তার ওপর হামলার ঘটনায় তদন্ত করতে অস্ট্রেলিয়ার একটি তদন্ত দলও সহায়তা করছে। হামলার দায়িত্ব কেউ স্বীকার করেনি। তাই প্রশ্ন উঠেছে, তার ওপর হামলা করল কারা?

মালদ্বীপের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ। তিনি অনেক চড়াই-উতরাই পার করে আজ এ অবস্থানে। সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদ সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত দেশটির বর্তমান পার্লামেন্টের স্পিকার। তিনি দেশের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। বৃহস্পতিবার রাতে মুসলিমরা যখন তারাবির নামাজ পড়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন তখনই রাজধানী মালের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় রক্তের ছড়াছড়ি দেখতে পান। এরই মধ্যে আহত অবস্থায় পড়েছিলেন নাশিদ। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাস্তার যেখানে মোটরবাইকে বিস্ফোরণ ঘটে সেটি নাশিদের পারিবারিক বাড়ির কাছে। তিনি যখন গাড়িতে উঠছিলেন তখনই বিস্ফোরণটি ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, ৫৩ বছর বয়সি নাশিদ যখন রাস্তায় রাখা তার গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন তখনই রিমোট নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও মোটামুটি শান্তির দেশ মালদ্বীপ। সেখানে এ ধরনের হামলার ঘটনা খুবই বিরল। কিন্তু একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়। অনেকে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তবে কেউ কেউ বিস্ময় তো প্রকাশ করেননি, বরং এটা ঘটতে পারে বলে মনে করেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত আহমেদ শহীদ মনে করেন, নাশিদকে হত্যার জন্য এটা ছিল খুবই সুপরিকল্পিত একটা হামলা। নাশিদের সাবেক মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শহীদ বলছেন, সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রশংসিত নাশিদের ওপর হামলা করা হয়েছে সহিংসতা সৃষ্টির জন্য।

পুলিশ শনিবার জানিয়েছে, সন্দেহভাজন দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর বেশি কিছু জানায়নি পুলিশ। তবে দুটি গ্রুপের ওপর সন্দেহ করে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। প্রথমত চরমপন্থি এবং দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক বিরোধ। ৩০ বছরের স্বৈরশাসকের অবসান ঘটিয়ে ২০০৮ সালে বহু দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনে নাশিদ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিলেন। কিন্তু তিন বছরের মধ্যেই সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিদ্রোহে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। ক্ষমতায় ভেতরে-বাইরে নাশিদ ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন। তার ওপর হামলার পর ধর্মীয় নেতাদের অনেক সমর্থক সোশ্যাল মিডিয়ায় নাশিদের ধর্মীয় বিষয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত টেনে এনেছেন এবং সেগুলো শেয়ার করেছেন। অনেকে আবার ধর্মীয় চরমপন্থি গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার সেন্টার ফর মুসলিম স্টেটস অ্যান্ড সোসাইটিস এর রিসার্স ফেলো আজিম জহির বলছেন, এটা স্পষ্ট যে, ধর্মীয় চরমপন্থিরা নাশিদকে মুরতাদ মনে করছে যাকে হত্যা করা জায়েজ। দেশটিতে চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে কথা বলা মানুষের মধ্যে নাশিদ এগিয়ে। আড়াইশর বেশি মালদ্বীপের নাগরিক সিরিয়া এবং ইরাকে আইএসে যোগ দিতে গিয়েছিল। নাশিদ এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলেছিলেন।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, সিরিয়া, আফগানিস্তান এবং মালদ্বীপে আইএসের এক জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা মালদ্বীপের নাগরিক আহমেদ আমিন। ২০০৭ সালে মালদ্বীপে প্রথম সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। আইএস সাধারণত রমজানে হামলায় উত্সাহ দিয়ে থাকে। ২০০৭ সালেও রমজানে হামলা হয়। জহিরের মতে, মালদ্বীপের আইএস বাহিনীর এ ধরনের হামলা করার সামর্থ্য আছে। শুক্রবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হামিদ স্বীকার করেছেন, চরমপন্থিদের এই ধরনের হামলা করার সামর্থ্য আছে। তিনি জানান, অনেক চরমপন্থি জেলে এবং অনেকেই মুক্ত। কারণ এদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ নেই।  নাশিদের ওপর হামলা হতে পারে এমন কোনো তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে ছিল না। দেশটির সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ধিয়েনা সাইদ বলেন, হামলার জন্য দুটি গ্রুপ কাজ করতে পারে। একটি রাজনৈতিক এবং অন্যটি ধর্মীয় আদর্শ।

সাইদ বলেন, পর্যটন খাত থেকে ৭৯ মিলিয়ন ডলার আত্মসাতের ঘটনায় অনেক রাজনীতিক জড়িত। নাশিদ তাদের শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। এসব রাজনীতিকরাও হামলার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে টুইটারে স্পিকার নাশিদ জানিয়েছিলেন,                 যারা আত্মসাত্ থেকে লাভবান হয়েছেন তাদের তালিকা পেয়েছেন তিনি। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা   ঘটে। এই কেলেঙ্কারির জেরে সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ ইয়ামিন              নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরই প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সোলিহ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেন। তদন্তে ২৫০ জন রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তার নাম পাওয়া গেছে। কিন্তু এর মধ্যে কেবল সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনই অভিযুক্ত হয়েছেন।