পত্রিকার খবরানুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বিভিন্ন অনুষদের বেশিরভাগ বিভাগে তীব্র সেশনজট সৃষ্টি হইয়াছে। ফলে, শিক্ষার্থীদের ছয় মাস মেয়াদি সেমিস্টার শেষ করিতে লাগিতেছে আট মাস; চার বত্সর মেয়াদি স্নাতক শেষ করিতে পাঁচ বত্সর এবং স্নাতকোত্তর শেষ করিতে সাত বত্সরের বেশি সময় লাগিয়া যাইতেছে। নবীন বিভাগ নাট্যকলায় সেশনজটের অবস্থা ভয়াবহ। নূতন এই বিভাগের শিক্ষক ও কর্মকর্তা সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা সেশনজটে ভুগিতেছেন। ইংরেজি বিভাগে সেশনজট সবচাইতে বেশি। ক্লাস ও পরীক্ষার জন্য কোনো একাডেমিক ক্যালেন্ডার মানা হয় না। এক মিডটার্ম পরীক্ষায় সময় তিন-চারবার পরিবর্তনেরও অভিযোগ আছে। অথচ, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এই বিভাগে চালুকৃত সান্ধ্যকালীন কোর্সের চিত্র উল্টা। অভিযোগ আছে, শিক্ষকরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা না নিয়া সান্ধ্যকালীন কোর্সের ক্লাস-পরীক্ষায় অধিক ব্যস্ত থাকেন। তদুপরি, অধিকাংশ শিক্ষকই বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন চাকরি করেন। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে চালুকৃত ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন নামের নূতন বিভাগটির অবস্থাও নাজুক। বিভাগটির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এক বত্সর এবং অন্যান্য শিক্ষার্থী প্রায় ৭ মাস পিছাইয়া ক্লাস করিতেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের এক বত্সরের জটের ফলে বিভাগটিতে মাস্টার্স পর্যায়ে এখন একইসঙ্গে তিনটি ব্যাচের ক্লাস হইতেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে স্পষ্ট বলা আছে যে, সেমিস্টার শুরু হইলেই শিক্ষকরা রুটিনমাফিক প্রতি সেমিস্টারে প্রতি ক্রেডিটের জন্য ১৫ ঘণ্টা ক্লাস নিবেন। মিডটার্ম পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট জমা, এমনকি প্রেজেন্টেশন গ্রহণের ১০ কর্মদিবসের মধ্যেই ফলাফল প্রকাশ করিবেন। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হইলে পরবর্তী আট সপ্তাহের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করিবেন। কিন্তু বেশিরভাগ বিভাগের শিক্ষক এসকল নিয়মের তোয়াক্কাই করেন না। জগন্নাথে বর্তমানে মোট ৩৬টি বিভাগে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী এবং প্রায় ছয় শতাধিক শিক্ষক আছেন। অর্ধশতাধিক শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে থাকিলেও বর্তমানে যত শিক্ষক আছেন, তাহা দিয়া ঠিকমতো বিভাগ পরিচালনা করা অসম্ভব নহে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষকরা ব্যক্তিগত কাজ নিয়াই অধিক ব্যস্ত থাকেন। একাডেমিক রুটিন অনুযায়ী ক্লাস-পরীক্ষা লইতে শিক্ষকদের এই অনীহা ও স্বেচ্ছাচারিতা, সান্ধ্যকালীন কোর্সে অধিক সময়দান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান এবং ক্লাসরুম সংকটের কারণে সেশনজট তীব্র হইতেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চিত্র সত্যিই হতাশাজনক। তবে কেবল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নহে, প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই কিছু কিছু বিভাগে তীব্র সেশনজট আছে। নূতন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সমস্যাটি অধিকতর প্রকট। সেগুলিতে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিয়া যেমন প্রশ্ন উঠিতেছে, তেমনই যথাসময়ে শিক্ষাজীবন শেষ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা হতাশায় ভুগিতেছেন। শ্রেণিকক্ষ সংকট বড় সমস্যা নহে, পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব গুরুতর সমস্যা বটে, কিন্তু সবচাইতে বড় সমস্যা হইল অঙ্গীকারের অভাব। যে শিক্ষক বাড়তি অর্থের প্রয়োজনে সান্ধ্যকালীন কোর্সে বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাসময়ে ক্লাস ও পরীক্ষা সম্পন্ন করিতেছেন, সেই শিক্ষকের কারণেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভোগান্তি পোহাইতেছেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি অনেকক্ষেত্রে এইসকল ফাঁকিবাজ শিক্ষকের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করিতেছে বলিয়া সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন। দায়িত্ববান ভালো শিক্ষকদের প্রণোদনার বিশেষ ব্যবস্থা নাই। এই পরিস্থিতির আশু পরিবর্তন আবশ্যক। শিক্ষার্থীরা যেন যথাসময়ে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করিতে পারে— সেই ব্যাপারে একটুও ছাড় দেওয়া চলিবে না। আর সেইজন্য উচ্চশিক্ষার যথাযথ পরিবেশও ফিরাইয়া আনিতে হইবে।
