অমর একুশে গ্রন্থমেলার চেতনা

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৪

পহেলা ফেব্রুয়ারি (২০১৯) থেকে শুরু হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এবারের মেলা নতুন সাজে সজ্জিত হচ্ছে। বিশেষত লেখকের সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ বাড়াতে প্রথমবারের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে চালু হচ্ছে ‘লেখক বলছি’ নামের মঞ্চ। প্রতিদিন পাঁচজন করে লেখক পাঠকের সামনে আসবেন নিজের নতুন বই নিয়ে। জানা গেছে লেখক-পাঠককে প্রাণবন্ত আলোচনার একটি প্ল্যাটফর্ম দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এ আয়োজনের মধ্যদিয়ে। বাংলা একাডেমির নতুন মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর বরাত দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক লিখেছে : ‘‘এবারের বইমেলার থিম করা হয়েছে ‘বিজয়’। বায়ান্নো, মুক্তিযুদ্ধ পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজার চেষ্টা করা হবে এবারের মেলা থেকে।’’ গত ১০ বছরের মতো এবারও বইমেলার উদ্বোধন করবেন চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে বিশেষ অতিথি থাকবেন পশ্চিমবঙ্গের কবি শঙ্খ ঘোষ। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো যোগ দেবেন ‘শেখ হাসিনা: যে রূপকথা শুধু রূপকথা নয়’ শীর্ষক গ্রন্থের মিশরীয় লেখক-সাংবাদিক মোহসেন আল-আরিশি। গ্রন্থটির অনুবাদ প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো মেলাকে কেন্দ্র করে খোলা হয়েছে www.ba21bookfair.com নামের একাডেমির নিজস্ব ওয়েবসাইট। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাঠকরা স্টলের নাম কিংবা নম্বর ব্যবহার করে জানতে পারবেন, কোথায় সেটির অবস্থান। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ‘পজ’ মেশিনের মাধ্যমে বই কেনার সুযোগ রয়েছে এবারের মেলায়। সবমিলে এবারের গ্রন্থমেলা হবে দৃষ্টিনন্দন ও পাঠকবান্ধব।

বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে ঘিরে ভাষা, সংস্কৃতি ও সৃষ্টিশীলতা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন এদেশে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা বিস্তারের অন্যতম অনুঘটক। অথচ বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে ইতিহাস বিকৃত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় গ্রন্থমেলা পরিণত হয়েছিল মূর্খদের আস্তাবলে, অপশক্তির কব্জায় ছিল আবদ্ধ। ২০১৮ সালের ১২ নভেম্বর আওয়ামী লীগ ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ সালকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ (২০২০) এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে (২০২১) বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে আমরা দেখব। গত ১০ বছরে মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন ও দিনবদলের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হয়েছে। আগামীতে আরো অগ্রসর হবে এদেশ।  ১৯৭৪ সালে বিশ্বের খ্যাতনামা কবি-লেখক-পণ্ডিতদের অংশগ্রহণে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রথম বাংলা সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এর উদ্বোধন করেছিলেন। এ উপলক্ষে সে সময় বাংলা একাডেমি তার নিজস্ব প্রকাশিত বই প্রদর্শন ও ম্যুরাল প্রদর্শনীর আয়োজন করে। তখন একাডেমি প্রাঙ্গণ সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে চুনের দাগ দিয়ে প্রকাশকদের জন্য কিছুটা জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয় বাংলা একাডেমি। সেই নির্দিষ্ট স্থানে প্রকাশকেরা যে যার মতো স্টল তৈরি করে বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এই আয়োজনের কোনো স্বীকৃতি দেয়নি বাংলা একাডেমি। এমনকি কোনো নামও দেয়নি। তবে ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমিকে মেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। তারপর ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। একাডেমি এবং বইমেলার নামকরণ ‘একুশে গ্রন্থমেলা’ করে ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ‘একুশে গ্রন্থমেলা’ পালিত হয়। আবার ১৯৮১ সালে ‘একুশে গ্রন্থমেলা’য় পরিবর্তন আনে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। ‘একুশে গ্রন্থমেলা’র মেয়াদ কমিয়ে ২১ দিনের পরিবর্তে ১৪ দিন ধার্য করে বাংলা একাডেমি। কিন্তু প্রকাশকরা বাংলা একাডেমির এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। তারা বাংলা একাডেমির এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের দাবি তুলে ধরেন। প্রকাশকদের এ দাবির মুখে ১৯৮২ সালে ‘একুশে গ্রন্থমেলা’র মেয়াদ পুনরায় বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়ে মেলার মেয়াদ করা হয় ২১ দিন করে এবং মেলার উদ্যোক্তা হিসেবে বাংলা একাডেমি সে মেলার আয়োজন করে। ১৯৮২ সালের ঐ মেলায় সহযোগী হিসেবে ছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি।

১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন কবি মনজুরে মওলা। তিনি বিশেষ কারণে সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে বাংলা একাডেমি থেকে বাদ দেন। ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি আবার ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র পুনঃআয়োজন করে। সে সময় প্রকাশকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে স্টলের সংখ্যা বাড়ানো হয়, সেইসাথে মেলার পরিসরও বাড়তে থাকে। ‘অমর একুশে’ গ্রন্থমেলা চলাকালীন প্রতিদিন বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আসর, লেখক আড্ডাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে বাংলা একাডেমি। সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভাষার চেতনাকে গৌরবান্বিত করা হয়। সাবেক মহাপরিচালক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক শামসুজ্জামান খানের আমলে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমি থেকে। শেখ হাসিনার উত্সাহে এই মহাপরিচালক প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থটি। পাঠকমহলে গ্রন্থটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অন্যান্য বছরের মতো চলতি বছর (২০১৯) অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে’র আয়োজন করা হবে। ওই সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশের নামকরা কবি-লেখকবৃন্দ অংশ নিবেন।

বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা তিন দশক পেরিয়ে এখন বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী বইয়ের মেলার স্বীকৃতি পেয়েছে। এই বইমেলা এখন আর শুধু বই কেনাবেচার স্থান নয়, একই সঙ্গে তা বৃহত্তর বাঙালির প্রাণের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বইমেলা উপলক্ষে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী অনেক বাঙালি ও বিদেশি নাগরিক মেলায় আসেন। আমরা মনে করি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী অমর একুশে গ্রন্থমেলাও ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-তালিকায় স্থান পাওয়া দরকার। অন্যদিকে কানাডা প্রবাসী প্রয়াত রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামের উদ্যোগে এবং তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এ বছর (২০১৯) একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের কুড়ি বছর পূর্ণ হলো। এদিক থেকেও বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলা বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। প্রতিবছর অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে বই লেখা, প্রকাশনা ও বিপণনে জোয়ার আসে।  মেলাতে সর্বাধিক সংখ্যক বই প্রকাশ ও বিক্রি হয়ে থাকে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, এখন দরকার বই-এর মূল্য হ্রাস এবং মানসম্পন্ন বই প্রকাশ করা। বিশেষ করে ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, বিশ্বমানের সাহিত্যের প্রকাশনার দিকে আমাদের আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে। একটি বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষিত, মার্জিত, রুচি-সম্পন্ন সংস্কৃতিবান সমাজ গড়ে তুলতে বই-এর ভূমিকা অপরিসীম।

n লেখক :অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা