বুড়িগঙ্গার বোবা কান্না

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৪

মোগলদের যুগেই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল বুড়িগঙ্গা। এ নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এ বাংলার জীবিকা, চলাচল, পরিবহন, কৃষ্টি, শিল্প, সভ্যতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন। কেননা এই বুড়িগঙ্গা দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মসলিন, নীল, আর পাট। বুড়িগঙ্গা ছিল একসময় বিশাল, গভীর আর প্রশস্ত এক নদী। একসময় এ নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে রূপালি ইলিশ আসতো, পালতোলা নৌকা চলতো নিজ গন্তব্যের উদ্দেশে। এ নদী দিয়েই সওদাগর ও ব্যবসায়ীরা বিশাল বিশাল বাণিজ্য জাহাজে চড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে আসতো। এভাবে ঢাকা হয়ে ওঠে প্রাচ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল। ফলে কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠে বুড়িগঙ্গার বুক। ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, বুড়িগঙ্গা ছিল ঢাকার প্রাণ। এর বুকে ভেসে আসতো কত পর্যটক ও কত সওদাগর! তাদের থাকা-খাওয়ার জন্য মোগল সুবেদার শাহ সুজা ১৬৬৪ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে তুলেছিলেন বড়কাটরা। সেখানে ছিল একটি সরাইখানা। সে সরাইখানায় যে-কেউ বিনা পয়সায় খাওয়া-দাওয়া করতে পারতো। সুবেদার মোকাররম খাঁ ছিলেন বুড়িগঙ্গার সবচেয়ে সুহূদ। তাঁর উদ্যোগে বুড়িগঙ্গায় বিভিন্ন ক্রীড়াশৈলীর আয়োজন হতো। তিনি নদীর তীরে প্রায় প্রতিদিন আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করতেন। নদীর বুকে অসংখ্য নৌকায় জ্বালাতেন ফানুস বাতি। এতে এক অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টি হতো। তত্কালীন সময় ভারতবর্ষের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রিয় স্থান ছিল বাকল্যান্ড বাঁধ ও বুড়িগঙ্গা। অবিভক্ত বাংলার সর্ববৃহত্ প্রদেশের মালিক বর্ধমানের মহারাজ বিজয়চাঁদ মহতাব বজরায় চড়ে ঢাকা আসতেন। বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সম্মানিত সদস্য হিসেবে ঢাকার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি রেলপথের পরিবর্তে নৌপথ ব্যবহার করতেন। বজরা থেকে বুড়িগঙ্গার তীরে নেমে মোটরগাড়িযোগে শাহবাগে বর্ধমান হাউসে উঠতেন। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসটি নির্মিত হয়েছিল বর্ধমানের এই মহারাজার আর্থিক সহযোগিতায়।

রাজধানীর কোল ঘেঁষে যে নদী একটা মহানগরকে এত কিছু দিলো, শত শত বছর ধরে বুকে আগলে রাখছে সেই বুড়িগঙ্গা এখন আর আগের মতো নেই। এখানে নেই স্বচ্ছ পানির প্রবাহ, মত্স্য সম্পদ কিংবা জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী। এককালে বুড়িগঙ্গা নদীকে বলা হতো রাজধানীর ফুসফুস। চারশ’ বছরের প্রাচীন নগর ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। ভয়াবহ দূষণে বুড়িগঙ্গা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর জীববৈচিত্র্য প্রায় ধ্বংস। হঠাত্ করে এ ঘটনা ঘটেনি। দীর্ঘ চল্লি­শ বছরের নগর জীবনের বিরূপ প্রভাবে দূষিত এ বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গা দূষিত হওয়ার তিনটি মুখ্য কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।  ১. মানুষের মলমূত্র বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মিলিত হওয়া ২. বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত কাঁচাবাজারের (শ্যামবাজার) উচ্ছিষ্ট আবর্জনা সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ফেলা এবং ৩. বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত বেশকিছু শিল্প-কারখানার মোট ৬২ প্রকারের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি বুড়িগঙ্গায় পতিত হওয়া। এছাড়া আরও একটি কারণ-বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ডকইয়ার্ডে প্রায় সারাবছরই জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কাজ চলতে থাকা। সেখান থেকেও শিল্পজাত আবর্জনা নদীতে পতিত হয়। রীতিমতো বিষাক্ত বর্জ্যের বহমান আধারে পরিণত হয়েছে বুড়িগঙ্গা। প্রতিদিন বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গৃহস্থালি, সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা ও নৌযানের বিপুল পরিমাণ কঠিন ও তরল বর্জ্য নিক্ষেপ এমনকি ভূমিদস্যুদের অবৈধ আগ্রাসনে বুড়িগঙ্গা তার যৌবন হারিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণছে আজ।

অদূর ভবিষ্যতে হয়তো বুড়িগঙ্গা আর নদী নয়, খাল হিসেবে পরিচিতি পাবে। নগরবিদদের ধারণা- দুই তীরে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে এবং নদী খনন করে এখনো বুড়িগঙ্গার পুরনো রূপ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আর এজন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা। বুড়িগঙ্গা নদীর গুরুত্ব হারিয়ে গেলে ঢাকার গুরুত্বও একই সঙ্গে কমে যাবে। নদী যে-কোনো দেশের সার্বিক পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে মানব দেহের রক্ত-সংবহনতন্ত্রের মতো পরিবেশকে সতেজ ও সাবলীল রাখতে সাহায্য করে। অতএব এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরব থাকা মোটেও উচিত হবে না, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বহুতল ভবন নির্মাণ, যেখানে সেখানে ডিপ টিউবওয়েলের মাধ্যমে মোটরের সাহায্যে ভূগর্ভ থেকে অনিয়মিত পানি উত্তোলন, নদী-নালা, খাল-বিল ভরাটসহ এ ধরনের সব কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। নইলে বিপর্যয় থেকে ঢাকাকে রক্ষা করা যাবে না। এ বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে প্রতিটি মানুষকে সচেতন করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করেই ঢাকা নগরের উত্থান ও বিকাশ। আর ঢাকা নগরের  শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বিকাশের মূল কেদ্রবিন্দু ছিল বুড়িগঙ্গা নদী।

n লেখক : শিক্ষার্থী, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা