প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অনেক ঘাত-প্রতিঘাত আর চড়াই-উতরাই পার হয়ে আমরা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছি। এবারের নির্বাচনে মা-বোনরা, যারা প্রথম ভোটার, তরুণ ভোটাররা সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে। একটি সফল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। গতকাল বুধবার একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুর দিনে আবারও সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেওয়া বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রই একটি দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, তা আজ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রমাণিত সত্য। আমরা উন্নয়নের পথে এগিয়ে গিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছি। এ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়ে তুলবো। আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। ভোটারদের সার্বিক উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হবে। দেশে যাতে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করে, বাংলাদেশ যাতে জঙ্গিমুক্ত, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠে, মানুষের জীবন যেন শান্তির ও নিরাপদ হয় সেটাই আমাদের লক্ষ্য। অবশ্যই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো।
বিরোধী দলকে সংসদে কথা বলার জন্য সব সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, গণতান্ত্রিক ধারায় সমালোচনা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দলকে আশ্বাস দিতে পারি আপনারা যথাযথভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারবেন। এখানে আমরা কোনও বাধা সৃষ্টি করবো না। অতীতেও কোনও দিন আমরা বাধা দেইনি।
‘সৈয়দ আশরাফকে আপন
ভাই হিসেবেই দেখতাম’
আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে গতকাল সংসদে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আশরাফকে আমি সবসময় আপন ভাই হিসেবেই দেখেছি। যে কোনো সমস্যা হলে সে আমার কাছে আসতো, কথা বলতো। সিঙ্গাপুরে চিকিত্সাধীন থাকাবস্থায় সবসময় আমি তার খোঁজখবর নিয়েছি। তার স্ত্রী যখন অসুস্থ ছিল তখনও আমি নিয়মিত খবর রাখতাম। আমাদের দুর্ভাগ্য স্ত্রীর মৃত্যুর কিছুদিন পর আশরাফও চলে গেল। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। আশরাফের কথা বলতে আমার কষ্ট হচ্ছে। একথা বলতেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, তার এ মৃত্যু দেশ ও দলের জন্য সত্যিই খুব ক্ষতির। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও প্রতিভা ছিল অসাধারণ। আমার ভাই শেখ জামালসহ আশরাফ মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্রেনিং নিয়েছিল। দেশ ও দলের প্রতি সে খুবই নিবেদিত প্রাণ ছিল। আমি তাকে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছি, এরপর দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যও করেছি। আমি আশরাফের কিশোরগঞ্জের আসনের মানুষকে ধন্যবাদ জানাই। অসুস্থ থাকার পরেও আশরাফকে আমি মনোনয়ন দিলাম, সেখানকার ভোটাররা একবারও প্রশ্নও তোলেনি, সবাই তাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে মিয়ানমারের উপর চাপ অব্যাহত রাখুন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে দেশটির সরকারের উপর চাপ অব্যাহত রাখতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপমন্ত্রী জুয়্যান কুউক দেজং গতকাল বুধবার সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে গেলে তিনি এ আহ্বান জানিয়ে বলেন, মিয়ানমারকে অবশ্যই এখান থেকে তাদের নাগরিকদের ফেরত নিতে হবে। তাদের প্রত্যাবর্তনে আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহায়তা চাই। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ এবং ব্যবসা বাণিজ্য জোরদারের বিষয় বাংলাদেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি দুই দেশের মধ্যে কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে বিপুল সম্ভাবনার ওপর জোর দেন।
ভিয়েতনামের উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরদার হলে উভয় দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়ন ঘটবে। বৈঠকের শুরুতে জুয়্যান কুউক দেজং ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেন। তিনি শেখ হাসিনাকে বলেন, পুনরায় আপনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় আমাদের সরকার ও জনগণ অত্যন্ত খুশি। উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভিয়েতনাম সফরের আমন্ত্রণ পৌঁছে দেন। ভিয়েতনামের উপমন্ত্রী ১১ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটা বড় বোঝা। এ প্রসঙ্গে উপমন্ত্রী বলেন, ভিয়েতনাম রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতির অংশ হিসেবে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান দেবে।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ
খাতের উন্নয়ন ঘটেছে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ খাতের উন্নয়ন ঘটেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল পাইলট সায়েদ বিন হামদান আল-নাহিয়ান গতকাল বুধবার সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে গেলে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
প্রধানমন্ত্রী এবং ইউএই নৌবাহিনী প্রধান দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ইউএই নেভিতে জনশক্তি সংকট রয়েছে উল্লেখ করে সায়েদ বিন হামদান আল-নাহিয়ান বলেন, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ খাতের উন্নয়নে তার দেশের আগ্রহের কথা জানান।
এ সময় নৌবাহিনী প্রধান ভাইস এডমিরাল এএমএমএম আওরঙ্গজেব চৌধুরী, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল মাহফুজুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, ইউএইতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং ঢাকায় নিযুক্ত ইউএই রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন।
