সরব ঘাতক বজ্রপাত

আপডেট : ১৯ মে ২০২১, ২১:৩৮

 ‘বজ্রপাত’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একটি সাধারণ ইস্যু হলেও এশিয়া মহাদেশে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়াতে বজ্রপাতের প্রভাব প্রকট। সম্প্রতি বাংলাদেশে এর প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যদিও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত ঘটে ভেনিজুয়েলা ও ব্রাজিলে। কিন্তু সেখানকার তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর হার বেশি। সম্প্রতি আমাদের দেশে বজ্রপাতে নেত্রকোণায় সর্বাধিক ছয় জনের মৃত্যুসহ দেশের ছয়টি জেলায় মোট ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গাছপালা কেটে ফেলা, বাতাসে ধূলিকণা বেড়ে যাওয়া এবং মোবাইল টাওয়ারের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বেড়েছে বজ্রপাত। তবে আমাদের দেশে বজ্রপাতের মূল কারণ, দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট সেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে জলবায়ুর পরিবর্তনে বাংলাদেশে অতিমাত্রায় বজ্রপাত হয়ে থাকে। গবেষণায় এটাও বলা হয় যে, বর্তমানে বিশ্বে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর হার বাংলাদেশে।

বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলেও এটি প্রতিরোধের তেমন কোনো উপায় বের করা সম্ভব হয়নি। জেনে রাখা ভালো, বজ্রপাতে সৃষ্ট বিদ্যুত্ প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপ উত্পন্ন করে থাকে। কিন্তু ভয়াবহ এই বজ্রপাতের আগাম সংকেত দেওয়ার কৌশল বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বায়ুদূষণ তথা পরিবেশ দূষণের সঙ্গে বজ্রপাতের নিবিড় সম্পর্ক থাকায় বজ্রপাতের মাত্রা তো বৃদ্ধি পাচ্ছেই, সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্রতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, আবহাওয়া-সম্পর্কিত দ্বিতীয় বৃৃহত্তম ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বজ্রপাত। বজ্রপাতে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, বুয়েট, দুর্যোগ ফোরাম, গণমাধ্যমসহ একাধিক তথ্যমতে, বজ্রপাতে ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। এত বেশি মৃত্যুহারের জন্য মানুষের অসচেতনাকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকগণ। তারা বলেছেন, বজ্রপাত সম্পর্কে এদেশের প্রান্তিক ও নিরক্ষর জনসাধারণের সঠিক ধারণা না থাকার দরুন মৃত্যুহার বেশি। ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাতের সময়ও এদেশের লোকজন খোলা মাঠে কাজ করে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়।

উত্কণ্ঠার বিষয় হলো, বাংলাদেশে এত বেশি মৃত্যুহার হলেও বজ্রপাত নিয়ে কোনো গবেষণা ও তা থেকে মৃত্যুরোধের কোনো কার্যক্রম নেই। সীমিত পরিসরে বজ্রপাত সম্পর্কে শুধু পুস্তিকা এবং সেমিনারের মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে। সচেতনতার অভাব, বজ্রনিরোধক এবং উল্ল্যেখযোগ্য সরকারি কোনো কার্যক্রম না থাকায় প্রতি বছর এতগুলো প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। বজ্রপাতের কারণে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। যেহেতু বজ্রপাত প্রতিরোধের কোনো উপায় বের হয়নি সেহেতু বজ্রপাতের সময় আমাদের বেশকিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বজ্রপাতের সময় দালান বা পাকা ভবনের নিচে আশ্রয় নিতে হবে। ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। সবচেয়ে ভালো হয় কোনো একটি পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিতে পারলে। উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুত্ লাইন থেকে দূরে থাকতে হবে। উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি থাকে। খোলা স্থানে বিচ্ছিন্ন একটি যাত্রীছাউনি, তালগাছ বা বড় কোন গাছ ইত্যাদিতে বজ্রপাত হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি থাকে। বজ্রপাতের সময় বাড়িতে জানালার কাছাকাছি থাকা যাবে না। এ সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা যাবে না। বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বজ্রপাতের আভাস পেলে টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদির প্লাগ খুলে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

আশপাশে বজ্রপাত হওয়ার আগের মুহূর্তে কয়েকটি লক্ষণে তা বোঝা যেতে পারে। যেমন বিদ্যুতের প্রভাবে চুল খাড়া হয়ে যাবে, ত্বক শিরশির করবে বা বিদ্যুত্ অনুভূত হবে। এ সময় আশপাশের ধাতব পদার্থ কাঁপতে পারে। বজ্রপাতে আহত হলে, বজ্রাহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হূত্স্পন্দন ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এ বিষয়ে প্রাথমিক চিকিত্সায় প্রশিক্ষণ নিয়ে রাখা যেতে পারে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়