সকাল গড়িয়ে দুপুর। বুলু এখনো বাসায় শুয়ে আছে। অন্যসময় হলে সে কখন বের হয়ে যেত। এতক্ষণ শাহবাগের মোড়ে এ-গাড়ি থেকে ও-গাড়ি ফুল নিয়ে দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত সময় কাটত তার। প্রাইভেটকারের গ্লাস নামিয়ে যখন কেউ বুলুর হাতের সব ফুল কিনে নিতেন, তখন তার চোখেমুখে রাজ্যের সব সুখ ফুটে উঠত।
বুলুর মা এক অফিসারের বাসায় কাজ করে। অফিসার আপাতত কাজে যেতে নিষেধ করেছেন। মাস শেষ না হওয়ায় বেতন দেননি। সামনের মাসের তিন তারিখে বেতন আনতে বলেছেন। বাসায় দু’কেজি চাল আর অল্প কিছু তরকারি ছিল, তা এ কয়দিনে শেষ। সকালে রান্না হয়নি। একটা বিস্কুট ছিল সেটা ছেলেকে খেতে দিয়ে বুলুর মা নিজে পানি খেয়ে আছে। বুলুকে রেখে পাশের বাসার ছমিরন বিবির কাছে গেছে কোনো ব্যবস্থা হয় কি না। ছমিরন বিবির সাথে তার বেশ সখ্য। বিপদে আপদে দুজন দুজনার পাশে থাকে। একবার যখন ছমিরন বিবির স্বামী অ্যাক্সিডেন্ট করে পড়ে ছিল তখন তো বুলুর মা-ই তাদের চাল-ডালের ব্যবস্থা করেছিল। তার স্বামী এখন সুস্থ, তাদের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। এই বিপদে নিশ্চয় তারা এখন পাশে দাঁড়াবে—এ বিশ্বাস বুলুর মায়ের আছে।
গত বছরও ঠিক এই সময়ে বুলুদের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিভিন্ন সংগঠন তাদের নিয়মিত সহযোগিতা করত। খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যেত কোনোভাবে। এবার সেরকমটি দেখা যাচ্ছে না। মহামারি করোনায় সবকিছু অচল হয়ে পড়েছে। দেশে চলছে কড়া লকডাউন। ‘লকডাউন’ শব্দের সাথে আট বছরের বুলু কিছুটা পরিচিত হলেও তার মা কিছুই বোঝে না। শুধু বোঝে করোনা নামের কী এক ভাইরাস আসছে দেশে, তার জন্য গাড়ি-ঘোড়া সব বন্ধ, দোকানপাট বন্ধ, কাজকর্ম বন্ধ।
মাকে দেখে বুলু উঠে বসল। মায়ের হাত খালি দেখে তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছমিরন খালার কাছ থেকে ফিরে কখনো মাকে খালি হাতে দেখেনি সে। তাছাড়া এই দুঃসময়ে ছমিরন খালা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে সে আশা তারও। মায়ের কাছ থেকে বুলু জানতে পারে আজকের দিনটা কোনোরকমে পার করতে হবে। কালকের ব্যবস্থা ছমিরন খালা করবে। এদিকে ছমিরন খালা তার মায়ের জন্য একটা কাজের ব্যবস্থাও করে দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।
বুলু বিষণ্ন মন নিয়ে বাইরে বের হলো। মাস্ক পরে নিল। অনেকদিন হয়ে গেল মাস্কটা সে কুড়িয়ে পেয়েছে। রংটাও পরিবর্তন হয়ে গেছে। তাতে কী, মাস্ক তো আছে। মাস্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া বড় বিপদ তা সেও জানে।
জলিল ভাইয়ের সাথে দেখা। তারা একই গলিতে থাকে। ‘কী রে, কই যাস?’—জলিল ভাই জানতে চায়। ‘এই তো...!’ বুলুর বিষণ্ন চেহারা দেখে সে বলে, ‘চল!’ জলিল ভাইয়ের সাথে বুলুও সামনে চলল।
এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার আজ খাবারের প্যাকেট দেবেন। বুলুদের মতো আরো অনেকে এসে জড়ো হয়েছে খাবারের আশায়। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হয় না। পরে জানা গেল কমিশনারের ক্যামেরাম্যানের আসতে দেরি হওয়ায় খাবার বিতরণে বিলম্ব। পরদিন পত্রিকায় নিজের ছবিসহ খাবার বিতরণের সংবাদ ছাপা হবে। ভালো একটা ছবি না হলে হয়!—ভাবতে থাকেন কমিশনার সাহেব।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর এক প্যাকেট খাবার জুটল। প্যাকেটে খিচুড়ি, একটা সিদ্ধ ডিম আর দুই টুকরো শসা। প্যাকেট পেয়ে বুলুর সে কী আনন্দ! চোখেমুখে তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে। বুলু ভাবে এখনই খেয়ে নেবে। খিদেও অনেক বেশি। হঠাত্ বুলুর চোখে মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে। মায়ের কথা ভেবে সে খায় না। খাবারের প্যাকেট হাতে মায়ের কাছে ছুটে চলে।
