সিকদার আমিনুল হকের কবিতা

জীবনের বর্ণিল বিভা

আপডেট : ২০ মে ২০২১, ২০:৩৫

সিকদার আমিনুল হকের কবিতা শিল্পসুষমা সমৃদ্ধ। তাঁর কাব্যভাষা, বক্তব্য ও চিত্রকল্পের ব্যবহার বর্ণিল বিভায় আলোকিত। কবিতাকে তিনি নির্মাণ, উপমা ও বক্তব্যে সুষমামণ্ডিত করেছেন। চারপাশের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি সময়, সমাজ, ব্যক্তিগত আনন্দ ও বেদনা ধারণ করেছেন। সিকদার আমিনুল হক বহতা জীবন, আত্মশক্তি, দুই চোখভরা প্রকৃতি দেখার মুগ্ধতা নিয়ে জীবনানন্দ দাশের পৃথিবী পরিভ্রমণ করেছিলেন। মানুষের যাপিত জীবন তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। ভেতরের ক্ষরণ, বিয়োগ বেদনার কথা তিনি অকপটে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কবিতা আশা-নিরাশা, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও মনঃস্তত্ত্বনির্ভর। তিনি মানুষের বিচিত্র চাহিদার বহুতল আবিষ্কার করেছেন।

সিকদার আমিনুল হক ছয় দশকের বিচিত্র পথ ও ঠিকানায় নিজের নাম যুক্ত করেছিলেন নিজস্ব এক বার্তার মাধ্যমে। তাঁর কবিতা মানবিকতায় আর্দ্র, কিন্তু প্রয়োগকুশলতা, বক্তব্য, বিষয় ও উপমার মিথস্ক্রিয়ায় অনন্য। নতুন দিগন্ত বিহারে অদ্বিতীয়।

প্রবন্ধ, কবিতা ও ছড়া—এই তিনটি শাখায় সিকদার আমিনুল হক মোট ২২টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : দূরের কার্নিশ (১৯৭৫) তিন পাপড়ির ফুল (১৯৭৯) পারাবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতা (১৯৮২) আমি সেই ইলেক্ট্রা (১৯৮৫) বহুদিন উপেক্ষায় বহুদিন অন্ধকার (১৯৮৭) পাত্রে তুমি প্রতিদিন জল (১৯৮৭) এক রাত্রি এক ঋতু (১৯৯১) সতত ডানার মানুষ (১৯৯১) সুপ্রভাত হে বারান্দা (১৯৯৩) কাফকার জামা (১৯৯৪) সুলতা আমার এলসা (১৯৯৪) রুমালের আলো ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯৫) লোর্কাকে যেদিন ওরা নিয়ে গেলো (১৯৯৭) শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০০) বিষণ্ন তাতার (২০০২) ঈশিতার অন্ধকার শুয়ে আছে (২০০২)।

সতত ডানার কবি সিকদার আমিনুল হকের পঙিক্ত বিভাজন, দীর্ঘ বক্তব্য ও মুক্ত ছন্দে বিচরণ বিস্ময়কর। একধরনের মগ্নতা সিকদার আমিনুল হকের প্রথম পর্যায়ের কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায়। পরে দার্শনিক তত্ত্ব ও জীবনের ইতিবাচকতায় তিনি তাঁর কবিতা রাঙিয়ে দেন। সিকদার আমিনুল হক মানুষের আচরণ, সমাজ পরিস্থিতির অসঙ্গতি চিহ্নিত করে উচ্চারণ করেন : ‘এর চেয়ে ভালো হতো / যদি থাকতো রাত্রির বাতাস / একটি বারান্দার গ্রীল দেয়া খাঁচায় আমরা বসতাম মুখোমুখি।’ কবি মহত্। সহজে সত্য বলার ক্ষমতা তাঁর আছে। ‘কবিতাকে থাকতে দাও একা অস্পষ্ট আর পরস্ত্রীর মতো পবিত্র’ সিকদারের কবিতায় নারীর অস্তিত্ব অনেকভাবে এসেছে। প্রেমিকা, দেহজীবী, একাকী, বিষণ্ন নারী নিয়ে তাঁর কবিতা ব্যঞ্জনাময়। যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা, সান্নিধ্য ঘিরে তাঁর কবিতার বিষয় আবর্তিত হয়েছে।

মৃত্যু এক অনিবার্য সত্য। কবি কতবার মৃত্যুগন্ধে মাতোয়ারা হয়েছেন তার ঠিক নেই। উজ্জ্বল উদ্ধার : ‘সকলের ভাবনায় মৃত্যুই নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত / নিথর রাতেও তার প্রতিশোধ ভয়ংকর / মৃত্যু আসে ভিন্ন নামে / যতই করি না রাগবিদ্বেষ / মৃত্যু তখনও বসে সৌন্দর্যের মগডালে।’ (মৃত্যু বয়সী শিকারীরা / এক রাত্রি একঋতু)।

তিনি মৃত্যু বিষয়ক হূদয়গ্রাহী, সহজবোধ্য, অর্থপূর্ণ কবিতা রচনা করেছেন। জরাগ্রস্থ পৃথিবীর বিপক্ষে দঁড়িয়ে তিনি রূপবতী এক মায়াবী জগত্ তুলে এনেছেন। দিনের মানুষ, রাতের মানুষ, পথের মানুষ, মধ্যবিত্ত জীবন তাঁকে পেছনে নিয়ে যায়। বালিকার গোল্লাছুট, পিকনিক, প্রণয়, এমনকি দাম্পত্যের টানাপোড়েন বাদ যায় না কবিতার বিষয় থেকে—

‘ভোর থেকে আমার প্রিয় লাল জামার ওপরে

টিপটিপ করে পড়ছে কালো বৃষ্টির ফোঁটা

তুমি তুলে রাখো

খাবার টেবিলের ওপরে যেভাবে রাখো কমলালেবু

অথবা কয়েকটা রক্তাভ আপেল...

যদিও সেই প্লেটেই আছে কর্তিত আঙুল

যে আঙুল একজন কবির :

যার কবিতা ছিল প্রধানত কাম, সমুদ্র ও মানুষের...’

(আমার প্রিয় লাল জামা : সুপ্রভাত হে বারান্দা)

সিকদার আমিনুল হক সমাজ জীবনের চেনা বিষয়কে কবিতার উপকরণ করেছেন। একজন মানুষের ভেতরের ভাঙচুর, আনন্দ বেদনা চিহ্নিত করে তিনি অগ্রসর হওয়াকে মুখ্য বিবেচনায় এনেছেন। মানুষের অন্তরালের ভাবনাকে তিনি যথাযথভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর কবিতায় দেশীয় উপকরণের সাথে আন্তর্জাতিক বিষয়, উপমা যোগ হয়ে এক আলোকিত জগত্ উন্মোচিত হয়েছে। নগরের গঠন, সৌন্দর্য, চাকচিক্য ইতিহাস—তা হোক আমেরিকা, জাপান, ইংল্যান্ড  কিংবা ফ্রান্স—তাঁকে নতুনভাবে ভাবিয়েছে।

বিশেষ একজন মানুষের উদ্দেশে তাঁর উচ্চারণ একজন পুরুষের অন্তর্গত বোধকে কীভাবে ধারণ করতে পারে সিকদার আমিনুল হকের কবিতা পড়লে তা অনুধাবন করা যায় : ‘ভয় নেই আমার জন্য তোমাকে বেশি দিন / এমন দাঁতাল ভঙ্গিতে হাঁটু মুড়ে বসে থাকতে হবে না। / চুম্বনের প্রিয় ঠোঁটগুলি যেদিন থেকে বিরল হয়ে ওঠে / যখন স্বেচ্ছায় কেউ ব্লাউজ খুলে বুকের নরম হ্রদে হাত রাখতে বলে না... / তখনই মানুষ বুঝতে পারে, তার চেকবইয়ের পাতাগুলি ঝরা পাতার মতো খসে খসে অবশেষে / শেষ পাতার তুচ্ছ একটা অঙ্গে ঠেকেছে... / সেখানে এতো অল্প সঞ্চয় যে টোকেন নিতে স্পৃহা হয় না। / অসতর্ক আমি নই আমি বুঝতে পারি জীবনের সফলতা, বিফলতা / নেহাত বাজে কথা। নির্জলা সত্য হচ্ছে আমার জন্য কাক পক্ষী জাগার আগেই / খুব চতুর একজন কালো চামড়ার দস্তানা পরে বসে থাকে’ (খুব বেশি দিন অপেক্ষায় রাখবো না)

একজন মধ্যবিত্তের জীবনযাপন, অস্তিত্ব চেতনা ছিল সিকদার আমিনুল হকের কবিতা রচনার কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের নেতিবাচকতা পরিহার করে উজ্জ্বল দীপ্তি আর বেঁচে থাকার অনুভব তিনি বেছে নিয়েছিলেন। নির্জনতা, সমাজের চলমান ছবি, পানশালার একাকীত্ব, নারীর সৌন্দর্য তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে অনেকদিন।

সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে সিকদার ভেবেছেন। তিনি  শৈশব, গ্রাম, নগর, প্রকৃতি, নদী, বালিহাঁস, আকাশ, ফসল ও মানুষের সাথে তাঁর একাত্ম হওয়ার অভিজ্ঞতা কবিতাবদ্ধ করেছেন। সখেদে তাঁর উচ্চারণ : ‘সব কি আমার জন্য / বেসামাল নিসর্গের রূপ / কতো আর / নিতে পারি? স্বপ্নগ্রস্থ দেবদারু গুলি / দেয় না বাঁচার নিরাপত্তা, ফলে নিরর্থক লোভে / পাহাড়ে উঠেছি আমি মৃদু বাতাসের বহু আগে’ (বিশ্বাস করি না)।

মানুষের ভেতরের ব্যবধান, স্তরবিন্যাস, অভিমান, অবহেলা, প্রতিহিংসা ভালোবাসা, মনোভঙ্গি তাঁকে পীড়িত করে।

শহর চেহারা বদলে ফেলেছে। এখানে যারা বসত গড়ে তুলেছে তারা দমকল বাহিনী, অ্যাম্বুলেন্স, ট্রাফিকের বাঁশির শব্দে জেগে ওঠে, ঘুমিয়ে পড়ে। এখানে কোকিল ঢাকে না। প্রকৃতির রহস্যরাজি, মানুষ ও মানুষের গোপন কথা সযত্নে সিকদার আমিনুল হকের কবিতায় প্রতিঘাত তৈরি করে— ‘তোমার বয়স্ক ছেলে দয়ার ওপরে বাঁচে। শর্ত ছাড়া সবই ভালো’। হাজারো শর্ত, সন্ধি ও আপসের ঘেরাটোপে যেন প্রতিনিয়ত আমরা আটকা পড়ে গেছি। তাঁর আক্ষেপ কিংবা সান্ত্বনা প্রকাশের ভঙ্গি ভিন্নতর—‘ক্রন্দনের সুখ থেকে ওরা বঞ্চিত করবে না আমার / পরীক্ষারত মাও পাথরের মতো স্তব্ধ’ (বঞ্চিত মানুষদের জন্য কিছু লিখবো)।

সিকদার আমিনুল হকের কবিতায় একজন মানুষের রোদনভরা  দিনযাপন উঠে এসেছে। স্মৃতি, হতাশা, হাহাকার আর বেদনা তার সাথী।

আত্মজৈবনিক কবি সিকদার আমিনুল হক। তিনি কবি হয়েছেন অনুভূতিপ্রবণ মনন ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অভিঘাতে। তাঁর জীবনে যেমন অপার আনন্দ আছে তেমন রয়েছে বেদনা ও বিরহের প্রশান্ত ছায়া। সমাজের অবক্ষয়, মানবিক বিপর্যয়, সমাজ ব্যবস্থার অসমতা ও মানুষের অন্তর্গত বোধ তাঁকে কবি হিসেবে আবির্ভূত হতে সাহায্য করেছে। তাঁর কবিতা সমকালীনতা, রাজনীতি, প্রেম বিরহ বেদনায় আকীর্ণ। নারী-নিসর্গ সমানভাবে উপস্থিত থাকে তাঁর কবিতায়। নস্টালজিয়া ও জন্মগ্রামের টান সিকদার আমিনুল হক কবিতায় উপেক্ষা করতে পারেন না। সাম্য ও সৌম্যের দিকে তাঁর পক্ষপাত। তাঁর অভিজ্ঞ বাণীমালা ফল্গুধারার মতো মানুষের চেতনায় প্রবাহিত হয়ে মহাকালের গর্ভে গভীর চিহ্ন রেখে যাবে—এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।