নাজমুল হোসেন
একটি পাতিলে যেমন কয়েক লিটার পানি সমেত আগুন জ্বালিয়ে তাপ দিলে ধীরে ধীরে পানিটা বাষ্পে পরিণত হয়ে এক সময় পাতিলটি পানিশূন্য হয়ে যাবে। ঠিক তেমনি একেকটা গাছ কর্তন করার ফলে পৃথিবীর বুকে আগুন জ্বালানোর মাত্রা বাড়িয়ে দিই। সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন হ্রাস করি। যা ধীরে ধীরে পৃথিবীকে মানুষশূন্য করে দিতে পারে।
বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব লক্ষণীয়। এটি দিনে দিনে প্রকট আকার ধারণ করছে। বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা লক্ষ করা যায়। মরুভূমির মতো আবহাওয়া বিরাজ করছে। বৃষ্টি নেই, ঋতুর পরিবর্তন ঘটেছে। দিনে প্রচণ্ড গরম পড়ছে, তাপদাহে পুড়ছে দেশ। গত তিন বছরের জলবায়ুর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করলে তা সুস্পষ্ট। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে শতকরা ২৫ শতাংশের জায়গায় ১৫.১৮ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। তবে বিভিন্ন সংগঠনের দাবি ৭-৮ শতাংশ বনভূমি বিদ্যমান।
প্রতিনিয়ত অরণ্যবিনাশ হচ্ছে, বনভূমি উজাড় করে বসতবাড়ি স্থাপন করা হচ্ছে, গাছপালা কেটে বানানো হচ্ছে নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। গাছপালা সড়ক ভাঙন ঠেকাতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। আর সেই সড়কের পাশের গাছগুলো কেটে সড়কের ধস নামানো হচ্ছে। অবাধ বৃক্ষ উচ্ছেদনের ফলে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য আজ বিপন্ন। নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে বৃক্ষের ব্যবহার অপরিহার্য। তবে গাছ কাটা অপেক্ষা দ্বিগুণ হারে গাছ রোপণও জরুরি। কিন্তু তা আমরা করছি না। আমাদের বৃক্ষ রোপণে অনীহা দূর করার উপযুক্ত সময় এখনি।
গাছ আমাদের প্রতিনিয়ত হাজার হাজার লিটার অক্সিজেন দিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে উপস্থিত অক্সিজেনের শতকরা হিসেবে প্রতিদিন আমরা ৫০০ থেকে ২০০০ লিটার অক্সিজেন গ্রহণ করে থাকি। আর আমরা সেই অক্সিজেন ধ্বংস করছি নিজ হাতে। আমরা বলি, গাছ আমাদের পরম বন্ধু। আর গাছ ভাবে, ‘মানুষ আমাদের চরম শত্রু’। তারপরও গাছের কিছু করার নেই। কারণ মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী জীব। প্রাণীকুলে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন, জ্ঞানী ও জটিল মস্তিষ্কের অধিকারী। মানুষ কতটা নির্মম সেটা বিগত বছরগুলোর বনভূমি হ্রাসের হার লক্ষ করলে বোঝা যায়। শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলেই গত সাত বছরে ১০ শতাংশ বনভূমি কমে গিয়েছে। আমরা নিজ স্বার্থ হাসিলে বৃক্ষ নিধন করছি ঠিকই কিন্তু পরোক্ষভাবে নিজেরাই নিজেদের বাঁচার পথ বন্ধ করে দিচ্ছি। বনভূমি ধ্বংসের জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। এখনই সচেতন না হলে প্রাকৃতিক সম্পদ বাঁচাতে না পারলে, একটা পর্যায়ে আঙুল কামড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না। মানুষ আসবাবপত্রের অভাবে মরে না, মরে অক্সিজেনের অভাবে। কবির ভাষায় বলি, ‘দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য, লও এ নগর।’
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
