অমিতা সিনহা
এ সময়ের ডিজিটালপ্রেমী তিন তরুণী আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ নিয়ে। উন্নত ডিজিটাল বান্ধব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে স্ব-আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন তারা। এখন ওরা শ্রীভূমি মৃত্তিকার প্রযুক্তিবান্ধব আত্মপ্রত্যয়ী নারী।
২০১৮ সাল। মাত্র এইচএসসি পাশ করে বেকার সময় পার করছিলেন তরুণী তমা। তারই বড় ভাই তাকে খবর দেন অনলাইনে দেখেছি নারীদের সরকারিভাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, সেখানে তুমি আবেদন করো। কথা মতো কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করে নিলেন। কিছুদিন পর ইন্টারভিউয়ের ডাক। এরপর শুরু হয় প্রায় আট মাসের ‘আইটি’র প্রশিক্ষণ। এভাবেই শ্রীভূমি দক্ষিণ সুরমার তমা অল্প সময়ের মধ্যে আধুনিক কম্পিউটারের আইটি বিভাগে দক্ষ হয়ে উঠেন। পুঁজিকৃত দক্ষতায় বিভিন্ন বিভাগে চাকরির জন্য সাহস জুগিয়েছে। নিমেষেই হয়ে যায় তার চাকরিও। যে প্রতিষ্ঠানে সে সহকারী কম্পিউটার বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন, আজ ঐ প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার বিভাগ ও বিভাগীয় প্রধান। জানতে চাইলে ২৫ বছরের মোসাম্মাত ফারিহা তাসলিমা তমা মহিলা অঙ্গনকে বলেন, আইটি বিভাগে প্রশিক্ষণ আমার জীবনকে একেবারেই বদলে দিয়েছে। এজন্য ‘সি পাওয়ার প্রজেক্ট’-কে আমি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানায়। আইসিটির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য। তিনি বলেন, অভাবের সংসার ছিল। তাই পড়াশোনাও বেশ দূর এগিয়ে যেতে পারিনি। প্রজেক্টের অর্জিত অর্জন দিয়ে চাকরির পাশাপাশি ২০১৯ সালে নিজের একটি পেইজ ‘তমাস ফ্যাসন’ খুলে বিজনেস শুরু করেছি। মোটামুটি ভালোই চলছে। ইচ্ছে আছে ভবিষ্যতে একটি শোরুম করার। বর্তমানে আমি বিসমিল্লাহ কম্পিউটার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কম্পিউটার বিভাগ ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছি।
শুধু তরুণী তমা নন। তার মতো শ্রীভূমির তরুণী পিংকি রানী ঘোষ, রায়হান আক্তার ফাইমাসহ ৩৭২ জন তরুণী আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন বেশির ভাগ তরুণীরা। জানা যায়, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও রূপকল্পের জন্য বর্তমান সরকার নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘প্রযুক্তির সহায়তায় নারীর ক্ষমতায় প্রকল্প (সি পাওয়ার প্রজেক্ট: সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ফর উইমেন্স থ্র আইসিটি)’ শীর্ষক প্রকল্পের সূত্রপাত ঘটে। দেশের ২১টি জেলা ও ২১টি সদর উপজেলায় ১০ হাজার ৫০০ নারীকে এই প্রজেক্টে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য। প্রজেক্টে তিনটি ক্যাটাগরিতে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সিলেটে ২০১৮ সালে সি পাওয়ার প্রজেক্টে ৩৭২ জন নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তার মধ্যে ফ্রিল্যান্সার টু এন্ট্রাপ্রেনিউর ক্যাটাগরিতে ১২২ জনকে। আইটি সার্ভিস প্রোভাইডার ক্যাটাগরিতে ১২২ জনকে আর উইমেন কল সেন্টার এজেন্ট ক্যাটাগরিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ১২৮ জন নারীকে।
তমার মতো বছর ২৩ ছুঁইছুঁই শ্রীহট্টের লাক্কাতুরার বাসিন্দা পিংকি রানী ঘোষ বলেন, সি পাওয়ার প্রজেক্ট আমি আইটি সার্ভিস প্রোভাইডারের ওপর আট মাসের ট্রেনিং গ্রহণ করি। ট্রেনিং শেষে শিক্ষার্থীদের কাছে অনুদান হিসেবে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। ঐ টাকা দিয়ে অনলাইনে ‘হেভেন’ নামে নিজের পেইজ খুলে রকমারি কাপড় ও পোশাকের বিজনেস শুরু করি। শুরুতে আংশিক ক্ষতির সম্মুখিন হলেও বর্তমানে মোটামুটি বেশ ভালোই বিজনেস চালিয়ে যাচ্ছি। ৪র্থ বর্ষের অনার্স পড়ুয়া তরুণী আরো বলেন, বিজনেস ছাড়া আমি মার্কেটিং বিষয়েও কাজ করে যাচ্ছি। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলেই আইটি বিভাগে জব করার খুব ইচ্ছে। চলার পথে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে সি পাওয়ার প্রজেক্ট।
এক সময় আধুনিক প্রযুক্তি নাম শুনতেই খুব ভয় হতো, আজ সেই ভয় কেটে অনলাইনে একাই পেইজ খুলে ঘরোয়া খাবার সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছি, ভাবতে অবাক লাগে জানালেন প্রতিবেদককে বিশ্বনাথের বাসিন্দা রায়হান আক্তার ফাইমা (২৬)। মাস্টার্স পড়ুয়া তরুণী বলেন, আগে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার বলতেই গা শিউরে ওঠে। কিন্তু সেই ভয়ের জায়গাটা দূর করতে পেরেছি একমাত্র সি পাওয়ার ট্রেনিং প্রজেক্ট প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। প্রযুক্তিনির্ভর ট্রেনিংয়ের জন্য আমার ছোট বোন আমাকে উত্সাহ ও উদ্বুদ্ধ করেছিল। নয়তো এই প্রশিক্ষণ আমার জন্য অসম্ভব ছিল। যদিও এখনো বিভিন্ন সাইটে কম্পিউটার চাকরির সন্ধানে আছি, তবে আমি আমার পুঁজিকৃত প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজে উদ্যোক্তা করতে পেরেছি।
প্রজেক্টের প্রোগ্রামার ডিস্ট্রিক্ট ই-সার্ভিসের কর্মকর্তা মো. বশির উদ্দিন এ প্রতিবেদককে বলেন, সিলেটে সি পাওয়ার প্রজেক্ট ট্রেনিংয়ে অনেক তরুণী উপকৃত হয়েছে। অনেক উচ্চ পদেও ওরা চাকরি করে যাচ্ছে। আগামী দিনে উপজেলা পর্যায়েও খুব দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
