ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো বলিয়াছিলেন, যেইখানেই ক্ষমতার অস্তিত্ব, সেইখানেই প্রতিরোধ দানা বাঁধে। ইহার আলোকে অনেকে বলিয়া থাকেন অন্য ইউটোপিয়ার কথা। বিগত কয়েক শতকে এই বিশ্বের বিবর্তনচিত্রের দিকে তাকাইলে আমাদের নিকট উহা ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’ বলিয়া মনে হইতে পারে। ইহার মধ্যে যেমন স্বপ্ন রহিয়াছে, তেমনি রহিয়াছে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। প্রহসন আর ট্র্যাজেডি তো রহিয়াছেই।
মানুষ বিশ্বাস করে, কোনো পট-পরিবর্তনের পর তাহার এতদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবে ধরা দিবে। ব্রিটিশ-শাসিত উপমহাদেশে আমরা কী আশা করিয়াছিলাম? ব্রিটিশরা চলিয়া যাইবার পর আমরা কী পাইলাম? বস্তুত, আশা এবং মোহভঙ্গ হইতে সময় লাগে নাই পরবর্তী সময়ে। নানান ঝড়ঝঞ্ঝার পর তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই অনেক রক্ত ঝরিবার ভিতর দিয়া নূতন সূর্য উঠিয়াছে, পুনরায় দানা বাঁধিয়াছে নূতন স্বপ্ন। কিন্তু পট-পরিবর্তনের পর সেই ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষ হইতেও সময় লাগে নাই। যাহাদের রাষ্ট্রের জন্য প্রতিবন্ধক বলিয়া মনে করা হয়, তাহাদের সরাইতে যাহারা আসেন—তাহারা কি কোনো ম্যাজিক দেখাইতে পারিয়াছেন? অতঃপর পরিবর্তনের সিলসিলা চলিতেই থাকে। মাঝেমধ্যে সেই পরিবর্তন লম্বা সময়ের জন্য থমকাইয়া যায় বটে। কিন্তু পরিবর্তনই জগতের ধর্ম, তা সেই পরিবর্তন যত পরেই হউক না কেন? কিন্তু এই পরিবর্তন ও বিবর্তন যেই সকল কারণে ঘটানো হয়, তাহা যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থাকিয়া যায়। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবর্তন পরিণত হয় প্রহসনে। বিবর্তনের কুঠুরিতে ট্র্যাজেডি আসন পারে। তৃতীয় বিশ্বের এই ধরনের দেশের জন্য এই সকল পরিবর্তন ও বিবর্তন যেই ড্যামেজ করিয়া দিয়া যায়, তাহার অভিঘাতও হয় সুদূরপ্রসারী। দেখা যায় যে, তৃতীয় বিশ্বের অনেক জনপদেই রাষ্ট্রপরিচালকের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কখনো-সখনো এতটাই প্রাধান্য যে, তাহার দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের উপরই চাপিয়া বসে।
এই দীর্ঘ সময়ে তৃতীয় বিশ্বের কোথাও কোথাও যতটুকু উন্নয়নচিত্র দেখিতে পাওয়া যায়, অনেকই ইহাকে ইতিবাচকভাবে দেখিতে চাহেন। কিন্তু অবকাঠামোই কি সকল কিছু? পরবর্তীসময়েও তো অবকাঠামোগত উন্নয়ন হইবে নিশ্চয়ই। কিন্তু যথা জায়গায় যথাযথ করিত্কর্মা মানুষ না থাকিলে এই সকল বাহ্যিক উন্নয়ন কখনই সার্থকতা লাভ করিতে পারে না। অন্যদিকে ইহাও ভাবিয়া দেখিতে হইবে—উত্তরসূরিদের জন্য কী অবস্থা রাখিয়া যাওয়া হইতেছে। সার্বিকভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য ইহা হইল একটি নিষ্ঠুর ট্র্যাজেডি। ইহাতে যেই ধরনের ক্ষতি সাধিত হয়—তাহার কঠিন মূল্য শেষাবধি জনগণকেই চুকাইতে হয়। জনগণ তাহার নেতাকে নির্বাচিত করে জনগণের সেবা পাইবার জন্য। কিন্তু নির্বাচিত হইতে যদি জনগণের প্রয়োজনই না হয়, তাহা হইলে জনগণের প্রতি নেতার কেন দায় থাকিবে? ইহার ট্র্যাজেডি হইল—যাহাদের মাধ্যমে নেতারা নির্বাচিত হন, তাহাদের তখন মাথায় করিয়া না রাখিয়া উপায় থাকে না। বিস্ময়কর কথা হইল, প্রতিটি পট-পরিবর্তনের পর যাহারা আসেন, তাহারা কী ধরনের ক্ষতি সাধন করিল—সাধারণ জনগণও তাহা বুঝেন না। জনগণ দুই মুঠো সাহায্য, দান, ভিক্ষা পাইয়াই খুশি থাকে। যিনি যেইটুকু ললিপপ পান তিনি তাহার রস চাটিয়া লইতেই ব্যস্ত ও খুশি থাকেন। কিন্তু এই ধরনের ভিক্ষা দেওয়াও কি কোনো সমাধান? ইহা তো কোনো টিকসই সমাধান নহে। দুঃখজনকভাবে পট-পরিবর্তনের পর পূর্বসূরিদের এমন সকল অপরাধ দুর্নীতি অপকর্মের ফিরিস্ত বাহির হয়, যাহা ক্ষমতায় থাকিবার সময় তাহারা কল্পনাও করিতে পারেন না। সুতরাং স্পষ্ট করিয়া বলিলে, তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো জনপদের মানুষ গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করিতেছে। তাহারা যেন একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে বসিয়া আছে। উহার উত্তাপ ও হঠাত্ প্রকাশিত মৃদুমন্দ ধোঁয়াও দেখা যাইতেছে।
বোর্হেস লিখিয়াছিলেন, ‘জীবন স্বপ্ন নহে, কিন্তু সমবেত চেষ্টায় তাহা স্বপ্নের মতো হইতে পারে।’ আমরাও সমবেত চেষ্টায় ৩০ লক্ষ শহিদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছিলাম। এই লক্ষ লক্ষ শহিদের রক্ত আর নারীদের সম্ভ্রম বৃথা যাইতে পারে না। শহিদের রক্তের প্রতিটি ফোঁটার মূল্য আমাদের উত্তরসূরিরা কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়া লইবে নিশ্চয়ই। আমরা যেন ইহা ভুলিয়া না যাই।
