সে রাতে হঠাত্ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন হাফিজুর

আপডেট : ২৫ মে ২০২১, ০০:৪৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান ঈদের পরের দিন (১৫ মে-শনিবার) রাত ৯টার দিকে যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বহির্বিভাগের গেটে আসেন তখন তার পরনে ছিল মাত্র একটি শর্টস। শরীরে আর কোনো কাপড় ছিল না। হাফিজুর উপস্থিত লোকজনের কাছে মাফ চাইতে থাকেন। একপর্যায়ে বহির্বিভাগের গেটের সামনে এক ডাব বিক্রেতার কাছ থেকে দা নিয়ে পোঁচ মারেন নিজের গলায়। তীব্র বেগে বের হতে থাকে  রক্ত। সে অবস্থায় তিনি দৌড় দেন শহিদ মিনারের দিকে। সেখান থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে রিকশায় ঢাকা মেডিক্যালে নিতে গেলে তখন তিনি রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়েন এবং বলতে থাকেন, ‘আমি চিকিত্সা করব না, আমাকে মাফ করে দাও।’ পরে অন্য লোকজনের সহযোগিতায় তাকে ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হয়। এক ঘণ্টা বিশ মিনিট পর রাত ১০টা ২০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনের দোকানি, ডাব বিক্রেতা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, লাইব্রেরি ও ইনফরমেশন সায়েন্সের ছাত্র হাফিজুর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জন্য ঈদের পরের দিন তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসেন ঢাকায়।

ঈদের দুই দিন পর (রবিবার) হাফিজের খোঁজ নিতে শুরু করে তার পরিবার। কিন্তু তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফোন বন্ধ পেয়ে হাফিজুরের ভাই ফোন দেন হাফিজুরের বন্ধু বাপ্পীকে। এই বাপ্পী, অন্তু, মাসুদ ও রাফসানের সঙ্গেই সর্বশেষ কার্জন হলে আড্ডা দেন হাফিজুর। বাপ্পী হাফিজুরের ভাইকে বলেন, হাফিজুর বাড়ি চলে গেছে।

এদিকে হাফিজুরের খোঁজে নানা ধরনের তত্পরতা চালাতে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইম অ্যাকশনের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি মীর লোকমানসহ তার অন্য বন্ধুরা। গত শুক্রবার (২১ মে) রাতে এ প্রতিবেদককে তিনি জানান, নিখোঁজ হাফিজের সঙ্গে যারা চলাফেরা করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা জানাল, শনিবার রাত থেকে হাফিজুরের কোনো খোঁজ নেই। তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে কোন দিকে চলে গেছে। 

বাপ্পীর বরাত দিয়ে মীর লোকমান বলেন, ঈদের পরের দিন তারা মোটরসাইকেলে ঘুরতে বেড়িয়েছিল। এক রিকশাওয়ালা মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিলে তাকে মারধর করেন হাফিজুর। এরপর তারা কার্জন হলে বসে আড্ডা দেয়। এর কিছুক্ষণ পর হাফিজুর কার্জন হল থেকে বেরিয়ে এসে রিকশাওয়ালাদের কাছে গিয়ে মাফ চাইতে শুরু করে। হাফিজুর বলতে থাকে ‘আমাকে মাফ করে দেন।’ এ সময় নানা অস্বাভাবিক আচরণ করে হাফিজুর রহমান। বন্ধুদের ভাষ্যমতে, স্বাভাবিক হাফিজুর হঠাত্ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। একপর্যায়ে দৌড় দিয়ে চানখারপুল এলাকার দিকে চলে যায়। বন্ধুরা ভেবেছিল সে হয়তো ফিরে আসবে। সেজন্য তারা আর তার পিছু নেয়নি। তবে বন্ধুদের কথাবার্তায় কিছুটা সন্দেহ করেন বলে জানান মীর লোকমান।

হাফিজুর রহমান সেদিন হঠাত্ করে কেন এমন অস্বাভাবিক আচরণ করেছেন, তার সঠিক কোনো কারণ এখনো পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি। হাফিজুরকে না পেয়ে তার কিছু বন্ধুবান্ধব সন্ধান চালাতেই থাকেন। গত রবিবার ফের কিছু বন্ধু থানায় খোঁজ নিতে যান। তখন থানার ওসি মামুন অর রশিদ ১৫ মে রাতে ঢাকা মেডিক্যালের বহির্বিভাগের গেটে রহস্যময় আচরণ করা অজ্ঞাতনামা একজনের লাশের ছবি দেখান। অস্পষ্ট ঐ ছবির ব্যক্তিটির মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ছিল। তা দেখে বন্ধু রনো আনোয়ার নিশ্চিত হয় অজ্ঞাতনামা এই লাশই হাফিজুরের।

মামুন অর রশিদ জানান, ‘সাধারণত পরিচয়হীন লাশ হলে আমরা তা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে দিয়ে দেই। কিন্তু ঐ যুবকের লাশটি আমরা ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে রাখার ব্যবস্থা করি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন করতে আমরা শহিদ মিনার এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীকে অনুরোধ জানিয়েছি।

শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ-প্রতিবাদ : হাফিজুরের মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদে সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যে এবং বিকালে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিচার দাবি করেন। প্রশাসনকে অভিভাবকসুলভ আচরণ করার আহ্বান জানিয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বটা কী! আপনাদের দায়িত্ব আমাদের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু সেটাতে আপনারা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ।