মসজিদুল আকসা মুসলমানদের প্রথম কিবলা

আপডেট : ২৭ মে ২০২১, ২০:৫৪

(পূর্ব প্রকাশের পর)

মসজিদুল আকসার নির্মাণ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। একদল ইতিহাসবিদ মনে করেন, মসজিদুল আকসা মূলত হযরত আদম (আ)-এর মাধ্যমেই তৈরি হয়, যা পরবর্তী নবিগণ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করেন। আবার অনেকে মনে করেন, হযরত সুলায়মান (আ) এ মসজিদ নির্মাণ করেন। তবে সঠিক বক্তব্য হচ্ছে, হযরত ইবরাহিম (আ) কর্তৃক কাবাগৃহ নির্মাণের ৪০ বছর পর হযরত ইয়াকুব (আ) আল-আকসা মসজিদ নির্মাণ করেন। একটি হাদিস থেকে জানা যায়, হযরত আবুজর গিফারি (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করি, হে আল্লাহর রসুল! সর্বপ্রথম কোন মসজিদ নির্মিত হয়েছে? তিনি বলেন, মসজিদুল হারাম। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, তারপর মসজিদুল আকসা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, উভয়ের মধ্যে ব্যবধান কত বছরের? তিনি বললেন, ৪০ বছরের ব্যবধান। (সুনানে ইবনে মাজাহ)।

হযরত ইয়াকুব (আ)-এর উপাধি ছিল ইসরাইল। তাঁর দিকে সম্বোধন করে তাঁর বংশধরকে বনি ইসরাইল বলা হয়। হযরত ইয়াকুব (আ) তার বংশ বনি ইসরাইলসহ জেরুজালেমে বসবাস করতেন। কিন্তু তার শেষ বয়সে বনি ইসরাইল হযরত ইউসুফ (আ)-এর আহ্বানে মিশরে প্রবেশ করেন। হযরত ইউসুফ (আ) হযরত ইয়াকুব (আ)-এর সন্তান ও আল্লাহর নবি ছিলেন। পরে বনি ইসরাইল মিশরে ফেরাউনের দ্বারা নির্যাতিত হয়। হযরত মুসা (আ)-এর যুগে তার সাহায্যে বনি ইসরাইল মিশর ত্যাগ করে। ফলে পুনরায় তাদের জেরুজালেমের পবিত্র স্থানে ফিরে আসার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু জেরুজালেমের জালেম অধিবাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলে। তাদের ভীরুতা ও কাপুরুষতার জন্য আল্লাহ তাআলা সিনাই মরু প্রান্তরের তিহ ময়দানে তাদের ৪০ বছর মরু জিন্দেগি যাপনের শাস্তি প্রদান করেন।

এদিকে হযরত মুসা (আ) আল্লাহ তাআলার সঙ্গে নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ৩০ দিনের জন্য তুর পাহাড়ে গমন করেন। এ সময় সামেরি নামক এক লোকের কুপরামর্শে বনি ইসরাইল গো-বাছুরের পূজা আরম্ভ করে। হযরত মুসা (আ) ফিরে এসে নিজ সম্প্রদায়ের ওপর অত্যন্ত রাগান্বিত হন। তাদের এই অপরাধের জন্য আকাশ থেকে এক বজ্রপাতের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তখন হযরত মুসা (আ) তাদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের পুনরায় জীবন দান করেন। কিন্তু বনি ইসরাইল হযরত মুসা (আ) ও হযরত হারুন (আ)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বনি ইসরাইলের অধিকাংশ লোক এই সামষ্টিক বিদ্রোহের আহ্বানে সাড়া দেয়। তারা হযরত মুসা (আ) ও হযরত হারুন (আ)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এবং বলে, তোমরাই বনি ইসরাইলের ধ্বংসকারী।

হযরত মুসা (আ) ও হযরত হারুন (আ)-এর পরবর্তী নবি হলেন হযরত ইউশা বিন নুন (আ)। তিনি বনি ইসরাইলের পরবর্তী বংশধরদের নিয়ে জেরুজালেমে পৌঁছান। হযরত ইউশা বিন নুন (আ)-এর পরবর্তী সময়ে আমালিকা সম্প্রদায়ের লোকেরা বনি ইসরাইলের ওপর আক্রমণ করে তাদের কাছ থেকে জেরুজালেমের অধিকাংশ এলাকা কেড়ে নেয়। পরে হযরত দাউদ (আ) জেরুজালেম শহর নিয়ন্ত্রণে নেন। হযরত দাউদ (আ)-এর ইন্তেকালের পর তার সন্তান হযরত সুলায়মান (আ) জেরুজালেমের শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ১০০৪ সালে আল আকসা মসজিদ পুনর্নির্মাণ করেন। এই মসজিদ নির্মাণে ৩০ হাজার শ্রমিকের সাত বছর সময় লেগেছিল। তিনি খুবই সুন্দর ডিজাইনে মসজিদটি নির্মাণ করেন।

৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা)-এর খিলাফতকালে সাহাবি হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ (রা)-এর নেতৃত্বে সমগ্র বায়তুল মুকাদ্দাস এলাকা মুসলমানদের দখলে আসার পর মুসলিম শাসকেরা কয়েকবার এ মসজিদের সংস্কার করেন। কিন্তু ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই খ্রিষ্টান সেনাপতি গডফ্রে ডিবো ইউনের নেতৃত্বে খ্রিষ্টান  ক্রুসেডররা ফিলিস্তিন দখল করে নেওয়ার পর আল-আকসা মসজিদের ব্যাপক পরিবর্তন করে একে গির্জায় পরিণত করেন।

এরপর ১১৮৭ সালে হিত্তিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিম বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইউবি (রহ) জেরুজালেম শহর মসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন। এ সময় পূর্বের নকশা অনুযায়ী আল-আকসা মসজিদ পুনর্নির্মাণ করা হয়। মসজিদটিতে দুটি বড় এবং ১০টি ছোট গম্বুজ রয়েছে। এ মসজিদ নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বর্ণ, সিসা, মার্বেলসহ বিভিন্ন প্রকার পাথর ব্যবহূত হয়েছে। ঐতিহাসিক এই মসজিদের আয়তন সাড়ে তিন হাজার বর্গমিটার। এই মসজিদে ৫ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। ঐতিহাসিকভাবেই মসজিদুল আকসা মুসলমানদের পবিত্র স্থান। হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলায়মান (আ) হযরত মুসা (আ)-এর পরবর্তী নবি ছিলেন। ইসলাম সব নবির ওপর ইমান আনার নির্দেশ দিয়েছে। তাই হযরত সুলায়মান (আ) কর্তৃক নির্মিত মসজিদুল আকসা আজ মুসলমানদেরই স্বাভাবিক উত্তরাধিকার। হযরত সুলায়মান (আ) ইহুদিদের সরাসরি নবি ছিলেন না, বরং মুসলমানরাই হযরত সুলায়মান (আ)-এর যথার্থ উত্তরাধিকারী। তাছাড়া হযরত মুসা (আ)-এর ওপর তুর পাহাড়ে তাওরাত নাযিল হলেও তিনি ফিলিস্তিনে বাস করেননি এবং ইহুদিদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তা সম্ভবও হয়নি। তাছাড়া এই মসজিদকে মুসলমানদের পবিত্র স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো।  (সমাপ্ত)

lলেখক :প্রাবন্ধিক ও কলেজশিক্ষক