যে কারণে নিয়ত করা প্রয়োজন

আপডেট : ২৭ মে ২০২১, ২০:৫৫

নিয়ত হলো ইবাদতের একটি মূল বিষয়। মানুষ যখন তার কল্পিত বিষয়টিকে বাস্তবে রূপদান করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, তখন নিয়তের মাধ্যম সে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কাজটি করতে থাকে। এই নিয়ত ছাড়া ইবাদতে কখনো পরিপূর্ণতা আসে না। এজন্য রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘নিয়ত ছাড়া কোনো আমল আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না’ (সুনানে কোবরা :৬/৪১)।  

নিয়ত কেন করব :নিয়ত করতে হবে অভ্যাস থেকে ইবাদতকে পৃথক করার জন্য। অন্যদিকে এক ইবাদত থেকে অন্য ইবাদতের পার্থক্য স্পষ্টকরণের জন্যও নিয়তের প্রয়োজন। কারণ, অভ্যাস আর ইবাদত কখনো এক হতে পারে না। যেমন ইবাদতের রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ। আবার অভ্যাসেরও কিছু ক্ষেত্র আছে। কেউ সকালবেলা খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে মরনিং ওয়ার্কের জন্য। আবার কারো উঠতে হয় সাংসারিক বিভিন্ন প্রয়োজনে। আবার কেউবা ওঠে আল্লাহ পাকের হুকুম পালনের জন্য। এই পার্থক্যগুলোর সঙ্গে নিয়তেরও একটি বিষয় জড়িয়ে আছে।  হজরত ওমর (রা) বর্ণিত এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘আমি রসুলুল্লাহ (স) কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক কাজের ফলাফল তার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক মানুষ তার কাজের পুরস্কার আল্লাহর কাছে এভাবে পাবে, যেভাবে সে নিয়ত করেছে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার প্রিয় রসুল (স) কে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে হিজরত করবে, সে অবশ্যই আল্লাহ ও তার রসুলের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াবি ফায়দা হাসিল বা কোনো রমণীকে বিবাহ করার উদ্দেশে হিজরত করবে, সে তার পুরস্কার তা-ই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে।’ (বুখারি, হাদিস নম্বর :১)

যেভাবে নিয়ত করবে :একনিষ্ঠভাবে অন্তর দিয়ে নিয়ত করতে হবে। যে কাজটি করার নিয়ত বা সংকল্প করলাম তা যদি শুধু মুখে মুখে হয় অথচ অন্তরের সঙ্গে মুখের কোনো যোগসূত্র তৈরি না হয়, তাহলে এ নিয়ত যথার্থ হলো না। তবে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা অন্তরের নিয়তকে স্থির রাখতে পারেন না বা কখনো কখনো অন্তরের এই নিয়ত নিয়ে মনে মনে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন অর্থাত্ স্মরণে রাখতে পারেন না, এসব মানুষের জন্য মৌখিকভাবে নিয়ত করা অবশ্যই জায়েজ।  মৌখিকভাবে নিয়তের করার বিষয়টি রসুলুল্লাহ (স) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে হাদিসের কোথাও বর্ণিত হয়নি। এমনকি চার মাজহাবের ইমামগণের বর্ণনায় কোথাও এই মৌখিক নিয়তের ব্যাপারটি পাওয়া যায়নি। নিয়তের বিষয়টি পুরো অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বিষয়। তার পরেও কেউ যদি ইবাদতে অধিক মনোযোগ সৃষ্টির জন্য নিয়ত করে থাকেন শরিয়ত তাকে এই মৌখিক নিয়তের অনুমতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে, নিয়তের আরবি উচ্চারণটি যেন অবশ্যই সঠিক হয়। অন্যথায় ভুল উচ্চারণের কারণে অর্থ পরিবর্তিত হয়ে অধিক মনোযোগের পরিবর্তে পাপ হয়ে যেতে পারে।

নিয়তের জন্য লক্ষণীয় :নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত—এ জাতীয় মৌলিক ইবাদতগুলো নিয়ত ছাড়া আদায় করলে তা শুদ্ধ হবে না। মূল ইবাদতের জন্য সহায়ক ইবাদত হিসেবে অজু, গোসল এ জাতীয় অন্যান্য ইবাদতগুলো শুদ্ধ হওয়ার জন্য নিয়ত আবশ্যক নয়। নিয়ত ছাড়াও এগুলো শুদ্ধ হয়ে যায়। তবে কেউ নিয়ত করলে সে অবশ্যই সওয়াব পাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তায়াম্মুম ও মাইয়েতকে (মৃত ব্যক্তি) গোসল দেওয়া সহায়ক ইবাদত হওয়া সত্ত্বেও নিয়ত করা আবশ্যক।

নিয়তের সময় :যে কোনো ইবাদতের নিয়ত করতে হবে কাজটির শুরুতে। তবে কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। যদি কেউ ভুলবশত সুবেহ সাদিকের আগে রোজার নিয়ত না করে তাহলে অর্ধদিবসের আগে নিয়ত করলেও ফরজ রোজা আদায় হয়ে যাবে। আর কাজা, মানত বা কাফফারার জন্য যে রোজা রাখা হয় তার নিয়ত সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্তের মধ্যবর্তী যে কোনো সময় বা সুবহে সাদিকের আগে নিয়ত করলেও তা আদায় হয়ে যাবে। কোরবানির নিয়ত হয় পশু ক্রয় করার সময় থেকে। অনরূপভাবে জাকাতের নিয়ত হয় অন্যান্য সম্পদ থেকে জাকাতের সম্পদ পৃথক বা প্রদানের সময় থেকে। আর হজের নিয়ত হয় ব্যক্তি যখন হজের জন্য নিবন্ধন করেন বা হজের ইহরাম বাঁধেন। প্রত্যেকটি কাজেরই একটি বিধিবদ্ধ নিয়ম আছে। সেভাবে কাজটি আদায় করলে তা সঠিক বলে গণ্য হবে। মহানবি (স) বলেছেন, ‘তুমি আল্লাহর ইবাদত করো এমনভাবে যেন তুমি তাকে দেখছ আর তুমি যদি তাকে না দেখতে পাও তাহলে ধরে নিবে আল্লাহ তোমাকে দেখছেন’ (মিশকাত)। ইবাদতে একাগ্রতা আনার জন্য এর চেয়ে উত্তম চিন্তা আর হতে পারে না। এই চিন্তা যদি কোনো বান্দার অন্তরে গেঁথে যায় সে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হবে। তাই নিয়তকে পরিশুদ্ধ করার পাশাপাশি অন্তরে এই চিন্তা নিয়ে আল্লাহ পাকের ইবাদত করতে হবে। 

lলেখক :ইসলামি গবেষক