ক্ষণে ক্ষণে মনে হয়, ‘মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্য আর নেই’

আপডেট : ২৭ মে ২০২১, ২২:১৪

চলমান করোনা মহামারি প্রতি মুহূর্তে মানুষকে জানান দেয়, মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্য আর নেই। সৃষ্টির সকল প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। মানুষ মাত্রই মরণশীল, কথাটি সকলের জানা থাকলেও সুখের অন্বেষণে, বড় হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায়, লোভ-লালসা চরিতার্থ করতে মানুষ এতটাই ব্যস্ত থাকে যে, জানা বড় সত্যই যেন ভুলে যায়। কারো কারো অন্যায়, অপরাধ, দুর্নীতি, আয় আর সঞ্চয়ের পাহাড় দেখে মনে হয়, মৃত্যু যেন এদের নিকটবর্তী নয়। তবে যখন হঠাত্ করে আপনজনের মৃত্যুরসংবাদ আসে, তখন হয়তো মৃত্যুর কথা মনে হয়। জীবনের তাগিদে আবার পুরোনো রূপে ফিরে যায়, কর্মব্যস্ততায় একসময় তা ভুলে যায়। সৃষ্টিকর্তা হয়তো মানুষকে ভুলে যাওয়ার এই বিশেষ গুণ দিয়ে তৈরি করেছেন। তবে মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করতে হয়, হঠাত্ করেই একসময় মৃত্যুর যম দুয়ারে এসে হাজির হয়, জীবনপ্রদীপ যখন নিভে যায়, শোকে মুহ্যমান করে রেখে যায় আপনজন। শুধু তো শোকই নয়, যিনি চলে গেলেন তিনি  হয়তো একটি পরিবারের কান্ডারি ছিলেন, যার ওপর গোটা পরিবার নির্ভরশীল ছিল। মৃত্যু অবধারিত হলেও হঠাত্ করে চলে যাওয়ায় বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে পরিবার। প্রিয়জনের হারানো বেদনা বুকে পাথর বেঁধে পুষে রাখে আজীবন। তবে সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই তাদের বেঁচে থাকারও অবলম্বন করে দেয়। অপঘাতে মৃত্যু, দৈব-দুর্বিপাকে মৃত্যু, মহামারিতে মৃত্যু, রোগে-শোকে মৃত্যু, যেন অপ্রত্যাশিত; হঠাত্ করে সব ঘটে যায়। নশ্বর পৃথিবীতে এটাই চিরন্তন সত্য। সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির সকল প্রাণকে আবার তার কাছে ফিরিয়ে নেন। আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের (মৃত্যুর) সময় হয় তখন তারা মুহূর্তকাল অগ্রবর্তী ও পশ্চাদবর্তী হতে পারে না’ (সুরা আন-নাহল, আয়াত ৬১)।

করোনা মহামারিতে মানুষ আজ গৃহবন্দি, আতঙ্কিত। শহর-গ্রাম, পাড়া-মহল্লা, জেলা-উপজেলা এখন লকডাউন, দেশে দেশে মানুষের মৃত্যুর মিছিল। অদৃশ্য এক জীবাণু বন্দি করেছে মানবসভ্যতাকে। আধুনিক বিশ্ব, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো পৃথিবীর বিজ্ঞানী-চিকিত্সকরা আজ যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কোভিড-১৯ নামক ভাইরাস মানবদেহে তাণ্ডব চালিয়ে কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য জীবন, প্রতিনিয়ত দেশে দেশে আক্রান্ত হচ্ছে অগণিত মানুষ। হাসপাতালগুলোতে রোগী রাখার বেড নেই, মরদেহ রাখার জায়গা নেই, লাশের পর লাশ দাফনে ক্লান্ত সবাই, মৃতদেহ সত্কারে আপনজন কাছে নেই। কাছ থেকে প্রতি মুহূর্তে আপনজনরা মৃত্যুকে দেখছে, যারা দেখছে তারাও শঙ্কিত। মৃত্যুর মিছিল থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় সবাই এখন প্রতিরোধ পন্থা অবলম্বন করছে। এ এক অদ্ভুত অভূতর্পূব মহামারি বা বৈশ্বিক বিপর্যয়; গোটা পৃথিবীকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। চিকিত্সাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি সত্ত্বেও এই মহামারি রোধে এখন পর্যন্ত পরিপূর্ণ কোনো সমাধান আসেনি। দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা আবিষ্কার করা হলেও তার কার্যকারিতা এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। করোনা ভাইরাস প্রতিনিয়ত তার রূপ পরিবর্তন করে আরো শক্তিশালী হয়ে মানবদেহে প্রবেশ করছে, পরিস্থিতি সামুলাতে চিকিত্সকরা আজ দিশেহারা।

সংক্রমণ থেকে মানুষকে বাঁচাতে সরকার সচেতনতামূলক বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। জনসাধারণের সুরক্ষার জন্য লকডাউন বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে মানুষের মধ্যে তেমন সচেতনতা নেই। গত বছর খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে করোনার প্রভাব খুব বেশি দেখা যায়নি বলে এবারও তারা এ বিষয়ে  সচেতন নয়। করোনার টিকা দেশে এলেও নানামুখী ইতিবাচক-নেতিবাচক আলোচনা মানুষের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়; ফলে খুব কমসংখ্যক মানুষ এই টিকা গ্রহণ করছে। তবে সরকার যথাসময়ে সাধ্যমতো সব পদক্ষেপই গ্রহণ করেছে। একদিকে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা, অন্যদিকে মাস্ক, পিপিই, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, প্রয়োজনীয় সব ওষুধপত্রের পর্যাপ্ত মজুত রেখেছে, অনেক হাসপাতালে উন্নত সুবিধা-সংবলিত করোনা ওয়ার্ড, আইসিইউর ব্যবস্থা করছে। দুষ্প্রাপ্য টিকা সংগ্রহ চলমান রয়েছে, শিগিগরই দেশেই তৈরি হতে যাচ্ছে রাশিয়া ও চীনের তৈরি করোনা ভ্যাকসিন ‘স্পুটনিক’ ও সিনোফার্ম। এতকিছুর পরও মানুষ নিজেরা সচেতন না হলে সরকারের একার পক্ষে করানো মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। করোনা মহামারিকে মানুষ নানাভাবে ব্যাখ্যা করে, কেউ বলে মনুষ্য সৃষ্টি, কেউ বলে প্রাণিদেহ থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে, কেউ বলে সৃষ্টিকর্তার শাস্তি, আবার কেউ বলে প্রকৃতির প্রতিশোধ। তবে যে কারণেই হোক না কেন, এই মহামারির তাণ্ডব আর মৃত্যুর মিছিল দেখার পরও অনেকে যেন মৃত্যুর কথা চিন্তা করে না। তাই তো পাপাচার, ব্যভিচার, নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা, প্রকৃতি ধ্বংস, মারণাস্ত্রের নিষ্ঠুর খেলায় এখনো তারা মত্ত রয়েছে। মানবজাতি যেন সত্যিই সীমা লঙ্ঘন করছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়, যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে’ (সুরা আর-রুম, আয়াত ৪১)।

সকল মৃত্যুই কষ্টের, তবে করোনায় মৃত্যুবরণকারী কারো কারো মৃত্যুর মুহূর্ত এতটাই কষ্টের, যারা কাছ থেকে  দেখেছেন তারা উপলব্ধি করতে পারেন। অক্সিজেনের আকুতি, বেঁচে থাকার আকুতি, কিংবা অক্সিজেন নিতে না পারায় দমবন্ধের কষ্ট, কেবলই মৃত্যুপথযাত্রীরাই অনুভব করে। আপনজন পাশে থেকে শুধু বুকফাটা চিত্কার আর অশ্রুজলে সিক্ত হতে পারে; করার কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। চিকিত্সকের শেষ চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। নিয়তির কাছে হার মেনে আপনজনদের কাঁদিয়ে চলে যায় পরপারে। এমনই পরিস্থিতিতে মৃত্যুর আতঙ্ক আজ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে গোটা পৃথিবীকে। তবে বিভিন্ন শতাব্দীতে পৃথিবীতে বহু মহামারি এসেছে, লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে; আর সেই মহামারি থেকে মানুষ বাঁচার উপায়ও খুঁজে পেয়েছে। তেমনিভাবে এই শতাব্দীর করোনা মহামারির কাছে মানুষ অসহায় হলেও সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপায় বেঁচে থাকবে তার মানবকুল, কিন্তু নিয়ে যাবেন অনেককে তার নিয়মে। এমনই এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ আমরা সকলে।

তাই এই মহাবিপর্যয়ের মধ্যে আমরা মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করি। অন্যায়-অত্যাচার অপরাধ থেকে নিজেদের দূরে রাখি। সামাজিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ন্যায়ের পথে চলি। নিজ নিজ ধর্মবিশ্বাসে ধর্মকর্ম করি। মহামারির হাত থেকে রক্ষা পেতে সৃষ্টিকর্তাকে বেশি করে ডাকি। মৃত্যুকে যারা ভুলে যায়, যুগে যুগে পৃথিবীতে আবির্ভূত প্রাকৃতিক দুর্যোগ-মহামারি তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আমি তোমাদের ভালো ও খারাপ অবস্থা দিয়ে পরীক্ষা করি। আর আমারই কাছে তোমাদের ফিরে আসতে হবে’ (সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৩৫)।

n লেখক : প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জাহানাবাদ, খুলনা