মহিলা অঙ্গন প্রতিবেদক
যৌন ও প্রজনন অধিকার সার্বিক অধিকার এবং আমাদের শরীরের মৌলিক মুক্তি—এ বিষয় দুটিকে ঘিরে আবর্তিত। এ বিষয় দুটিকে আমরা একান্তভাবে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে ধারণ করি। এসব অধিকারের মধ্যে একজন নারীর নিরাপদ গর্ভপাতের অধিকার সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। জাতি, সংস্কৃতি ও ধর্ম নির্বিশেষে এ অধিকারকে প্রায়শই খর্ব করা হয়।
সমাজের নেতিবাচক মনোভাব ও অসচেতনতা অনিরাপদ গর্ভপাতের ঝুঁকি তৈরি করছে। সমাজের কুসংস্কার আর বিধিনিষেধের দোলাচলে অনেক সময় নারীর জীবনই চলে যায়। তাই নিরাপদ গর্ভপাতের অধিকারকে দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরতে অনলাইনে এক আলোচনাসভার আয়োজন করে নারীপক্ষ।
বাংলায় অনুবাদকৃত প্রকাশনার ওপর আলোচনা করেন বাপসা নির্বাহী পরিচালক ড. আলতাফ হোসেন, হেলথ সিসটেম স্ট্রেনদেনিং অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা ডা. শারমিন সুলতানা। আলোচনা পরিচালনা ও স্বাগত বক্তব্য রাখেন নারীপক্ষের প্রকল্প পরিচালক সামিয়া আফরীন।
সভায় নিরাপদ গর্ভপাত নারীর অধিকার নিয়ে বক্তরা বলেন ‘নিরাপদ গর্ভপাত সেবা পাওয়া নারীর অধিকার। করোনা মহামারির মধ্যে নিরাপদ গর্ভপাত এবং প্রসব-পূর্ব ও পরবর্তী সেবা ব্যাপক হারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়ায় মাতৃস্বাস্থ্যে ঝুঁকি তৈরি করেছে। সভায় বলা হয়, গর্ভপাতের জন্য যত্রতত্র ওষুধের দোকান থেকে ইচ্ছেমতো ওষুধ কিনে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। আবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গর্ভপাতের জন্য স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে না আসা এবং সেবাদানকারী ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাবে ২৭ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী সেবা না পেয়ে ফিরে যান। আলতাফ হোসেন বলেন, সমাজে হেয় হওয়ার ভয়ে অনেক নারী শুধু স্বামী ছাড়া গর্ভপাতের বিষয়টি নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। অপরিকল্পিত গর্ভধারণে নারীরা যে ভোগান্তির শিকার হন, তা বিবেচনা না করে অনেকে গর্ভপাত করা নারীদের ঘৃণা করতে থাকেন। শারমিন সুলতানা বলেন, গর্ভধারণের ১০ সপ্তাহের মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী এবং ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত চিকিত্সকের কাছে নিরাপদ গর্ভপাত করার সরকারি নির্দেশ রয়েছে। অনেক মা এই সময় পার করে গর্ভপাত করতে আসেন। আবার অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিত্সক নেই। ফলে অনেকে গর্ভপাত করাতে এসে সেবা না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন হকের মতে, নিরাপদ গর্ভপাতসহ নিরাপদ মাতৃত্বের বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বেসরকারি সংগঠনগুলো এক হয়ে বিভিন্ন দাবি তুলতে পারে। আয়োজক সংগঠনের আরেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ফজিলা বানু বলেন, প্রজনন স্বাস্থ্যের প্রতি নারীর নিজের উদাসীনতা ও পরিবারের অবহেলা থাকে। করোনাকালে প্রসূতি নারীর স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়নি। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সমন্বয়ক মঞ্জুর কাদের আহমেদ বলেন, নিরাপদ গর্ভপাতের যাতে প্রয়োজন না হয়, সে জন্য জোর দেওয়া উচিত পরিকল্পিত গর্ভধারণের ওপর। কারণ, বারবার গর্ভপাতে নারী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। সভায় আরো বলা হয়—কেউ ইচ্ছাকরে গর্ভপাত করান না। বাধ্য হয়েই এপথ অবলম্বন করেন। কিন্তু এসময় নারীর অধিকার প্রায়শই খর্ব করা হয়। নারীকে ঘৃণা করা হয়। এতে লুকানোর বিষয় চলে আসে। লুকাতে গিয়ে অনেক সময় বিপদে পড়ে নারীর জীবনও চলে যায়।
প্রকাশনায় বলা হয়, নিরাপদ গর্ভপাত অধিকার প্রসঙ্গটি একই সঙ্গে জেন্ডার (লিঙ্গভিত্তিক) সমতা, নিজের শরীরের ওপর অধিকার ও মুক্ত ব্যক্তিসত্তা বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। তাই একে একটি স্বতন্ত্র অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। একই সঙ্গে নিরাপদ গর্ভপাত অধিকার অন্যান্য অধিকার বিশ্লেষণে সহায়তা করে এবং সামগ্রিকভাবে ব্যক্তির স্বতন্ত্র যৌন ও প্রজনন স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে অবদান রাখে নিরাপদ গর্ভপাত সেবা নিয়ে থাকে শুধুমাত্র কিশোরী-তরুণী, নারী ও শারীরিকভাবে নারী হিসেবে জন্ম নেওয়া জনগোষ্ঠী। এই সেবার অপ্রতুলতা ও অনুপস্থিতির কারণে এসব নারীদের জীবনে মৃত্যু, বিভিন্ন রকম শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যহানি ঘটে থাকে। রাষ্ট্র যখন নারীকে গর্ভধারণে বাধ্য করে নারী তখন কতবার গর্ভধারণ করতে চায়, কোন সময়ে সে গর্ভধারণ করবে এসব অধিকার তার আর থাকে না। রাষ্ট্রই নির্ধারণ করে নারী তার নিয়মিত গর্ভকালীন সময় পূর্ণ করতে চায় অথবা চায় না, কোন জনগোষ্ঠীর নারীরা নিরাপদ গর্ভপাত সেবা পাবে এবং কারা পাবে না—এসবই প্রজনন বিষয়ে নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ অধিকারের লঙ্ঘন। নারীর নিরাপদ গর্ভপাত অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো আপস-মীমাংসার স্থান নেই।
