সম্পাদকীয়

আমরা কাঁদব না

আপডেট : ০১ জুন ২০২১, ১৭:১৩

আমরা কাঁদব না। জ্যৈষ্ঠের তাপদগ্ধ দ্বিপ্রহরে তিনি আবার ফিরিয়া আসিয়াছেন শ্যামল বাংলার ছায়া সুশীতল ক্রোড়ে। মাত্র ছয়দিন আগে আমরা যখন তাঁকে বিদায় জানাই সুদূর পিণ্ডির পথে, তখনো আমরা কাঁদি নাই। আজ তিনি ফিরিয়া আসিয়াছেন। আজ কেন কাঁদিব? মায়ের দামাল ছেলে দীর্ঘ সংগ্রামের শেষে ক্লান্ত হইয়া ঘুমাইয়া আছেন। শাল তাল-তমালের ছায়ায় তাঁর চির বিশ্রাম-শয্যা রচিত হইয়াছে। দুখিনী বাংলা আবার তার হারানিধিকে বুকে ফিরিয়া পাইয়াছে। তাই আমরা কেন কাঁদিব? বজ্রাহত বনস্পতির চোখে কেহ কি কখনো শোকাশ্রু দেখিয়াছে? রাতের তারার চোখে যে অশ্রু টলোমলো, মায়ের চোখের স্নেহাশ্রুর মত তাই শিশির বিন্দু হইয়া ঝরিয়া পড়িতেছে তাঁর চির বিশ্রাম-শয্যার সবুজ ঘাসের আস্তরণে। আমরা বিদায় বলিব না। আমরা কাঁদিব না। আমরা শুধু বলিব, জীবনে যে সান্নিধ্য আমাদিগকে আশীর্বাদের মত নিত্য ঘিরিয়া রহিয়াছে, মরণেও তাহা যেন আমরা না হারাই।

একটি নাম নয়, যেন একটি যুগ। মানিক মিয়া এই নামটি শুধু আমাদের সাংবাদিকতার নয়, আমাদের সংগ্রামের ইতিহাসেও একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তিনি পরিণত বয়সে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন যেন কথা আমরা বলিব না। কিন্তু তাঁর নাতিদীর্ঘ জীবন আপন পরিধিকালেই একটি যুগ সৃষ্টি করিবার গৌরব অর্জন করিয়াছে। এই যুগ সংগ্রামের, সাধনার, ত্যাগের এবং দুঃখ ও নির্যাতন বরণের যুগ। নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য নয়, পূর্ব বাংলার গণমানুষের জন্য বার বার তিনি হাসিমুখে কারাবরণ করিয়াছেন। তাঁর প্রিয় ইত্তেফাকের কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়াছে, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হইয়াছে। দুঃখের তিমির পথে সকল সময় সত্যের বিভা জলিয়া ওঠে নাই। তথাপি তিনি ছিলেন অবিচল, আপোষহীন। জীবনের শেষ কয় বছরের কারা নির্যাতন, কণ্ঠরুদ্ধ ইত্তেফাকের মানসিক যন্ত্রণা তিলে তিলে তাঁর জীবনী শক্তিকে ক্ষয় করিয়াছে। তবু সংগ্রামে তিনি পরাভব স্বীকার করেন নাই। তাঁর এই মৃত্যু তাই এক সংগ্রামীর মৃত্যু, দেশ আর মানুষের জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণের মহাপ্রয়াণ। এই প্রয়াণে আমরা কাঁদিব না। শুধু প্রার্থনা করিব, এই মৃত্যুঞ্জয়ী সাধনার সংগ্রামী উত্তরাধিকার অর্জনের গৌরব যেন আমরা লাভ করি।

বিদগ্ধ বুদ্ধির প্রভাব কিংবা নাটকীয় চমত্কারিত্ব তাঁর সাংবাদিকতায় ছিল না। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে ব্যবহার করিয়া তিনি এক নুতন সাংবাদিক ভাষা সৃষ্টি করিয়াছিলেন। আর এই ভাষার তিনি প্রত্যয় কথা বলিতেন প্রদেশের কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক মঞ্চের কলামে মোসাফির নামে। জনসাধারণ তাঁর ভাষা বুঝিতেন, তার ভাষার আবেদন গিয়া পৌঁছিত তাঁহাদের হূদয়ের মাঝে। তিনিও জনসাধারণকে বুঝিতেন। তাদের মৌন, মুক্ত মুখের ব্যথা বেদনা সরব হইয়া উঠিত তার কলমে। এই লেখার যাদুই তাকে সাধারণ মানুষের অতি আপন করিয়া তুলিয়াছিল। আর সাধারণ মানুষের ঘরের খবর, মনের খবরও তাঁর কাছে অতি চেনা, অতি জানা বিষয়বস্তু হইয়া উঠিয়াছিল। জনসংযোগই ছিল তাঁর লেখনীর শক্তির উত্স। জনসংযোগই ছিল তাঁর সাংবাদিক সাধনার লক্ষ্য। জনসাধারণের জন্য, দেশের জন্যই তিনি সাংবাদিকতা করিয়াছেন, কায়েমী স্বার্থের সকল নির্যাতনের মুখে নিঃশেষে সকল জীবনীশক্তি বিলাইয়া মৃত্যুহীন আদর্শের পতাকা ঊর্ধ্বে উত্তোলিত করিয়া রাখিয়া গিয়াছেন। আমরা এই পতাকা অর্ধনমিত করিব না। আমরা কাঁদিব না। শুধু বলিব, তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শক্তি।

বাংলাদেশ কাঁদো, বাংলার মানুষ কাঁদে। বাংলার নীলাকাশ হইতে ঝড়ের বেগে শোকাশ্রু নামিয়া আসুক। আমরা কাঁদিব না। আমরা তাহাকে দেখিয়াছি ’৫৪ সালের নির্বাচনে জনতার জয়-মিছিলের পুরোভাগে। আমরা তাঁকে দেখিয়াছি ভাষা ও সংস্কৃতি বিরোধী আন্দোলনে নির্ভীক লেখনী হাতে। ঝড়ে, বন্যার এদেশের মানুষের জন্য তিনি ভিক্ষা মিছিলে শামিল হইয়াছেন আবার এদেশের মানুষের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার জন্য সর্বস্ব হারাইয়া হাসিমুখে কারাবরণ করিয়াছেন। সংগ্রামের ডাকে, সাধনার ডাকে, নির্যাতন ও ত্যাগবরণের ডাকে যিনি ছিলেন সকলের পুরোভাগে, তাকে আমরা হারাই নাই, তাঁকে আমরা হারাইতে পারি না। ইত্তেফাক তাঁর আদর্শের পতাকা চিরকাল বহন করিবে। ইত্তেফাক তাঁর আদর্শের জন্য বাঁচিয়া থাকিবে। আবার প্রয়োজন হইলে তাঁর আদর্শের জন্যই মৃত্যুবরণ করিবে। আমরা কাঁদিব না। শুধু বলিব, দুঃখের তিমিরে যদি জলে সত্যের আলোক, তবে তাই হোক, তবে তাই হোক।

প্রকাশকাল:২ জুন, ১৯৬৯

ইত্তেফাক/জেডএইচডি