শফিকুর রহমান রয়েল
সোলায়মান এতিম হয়েছিলেন ১৪ বছর বয়সে। প্রণয় সত্ত্বেও তার বাবাকে মেরে ফেলেছিল এক নারী। আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সের ঝলমলে সব শপিং মল ও বিলাসবহুল হোটেল থেকে ১৫৫ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত এক জেলায় বসবাস। বাবার মৃত্যু সত্ত্বেও চলতে গিয়ে তার খুব একটা কষ্ট হচ্ছিল না। দক্ষিণ আফ্রিকার এক খনিতে কর্মরত বড় ভাই বাড়িতে যে অর্থ পাঠাতেন, তাতে তার খাওয়া-পরার কোনো কষ্ট হচ্ছিল না। কিন্তু এ সুখটুকুও বেশিদিন স্থায়ী হল না। বাবার মৃত্যুর দু’বছর পরই ভাই এইডসে আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসলেন দেশে। পেটের তাগিদে সোলায়মানকে জড়িয়ে পড়তে হল চুরি-ছিনতাইয়ে। চুরির মাল একটি গ্যাস স্টেশনে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা খাওয়ায় দুই বছরের জেল হয়ে যায় তার। এর মধ্যে মারা যায় ভাই।
জেল থেকে মুক্তির পরও দারুণ কষ্টে দিন কাটছে সোলায়মানের। কেউই তাকে বিশ্বাস করে না বলে কাজ দিতে চায় না। এ অবস্থায় তিনি আবার চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়বেন কি-না সে চিন্তায় ব্যস্ত। কাজ না পাওয়ার ব্যাপারে তার বক্তব্য হচ্ছে,‘ আসলে বিশ্বাস-অবিশ্বাস মুখ্য কোনো বিষয় নয়। বস্তুত আলজেরিয়ায় দারুণ কাজের সঙ্কট চলছে। আমার আশেপাশের প্রায় অনেক তরুণই বেকার। খনি-সমৃদ্ধ আলজেরিয়া প্রত্যাশার চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অথচ দেশটিতে বিরাজ করছে তীব্র যুব বেকারত্ব। সোলায়মানের বয়স এখন ঊনিশ চলছে। সহসাই চাকরি পাওয়ার আশা তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।
সুখবর হচ্ছে, আলজেরিয়া আফ্রিকা মহাদেশের তৃতীয় সর্বোন্নত দেশ। গড় আয়ু ৭৬.৩ আর মাথাপিছু জিএনআই ১৩,৮০২ মার্কিন ডলার। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানির ওপর আলজেরিয়ার অর্থনীতি নির্ভরশীল। জিডিপিতে হাইড্রোকার্বন খাতের অবদান ৩০ শতাংশ। রপ্তানি থেকে মোট আয়ের ৯৫ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। অথচ স্থানীয় লোকজনের জন্য চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে খুবই কম। দেশটিতে মিল-ফ্যাক্টরি বলতে তেমন কিছুই নেই। আলজেরিয়া তার শ্রমশক্তিকে ধারণ করতে পুরোপুরি সমর্থ নয়, যেখানে প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ লোক। বেসরকারি খাতের অবস্থা সঙ্গীন আর সরকারি খাতে কাজ পাওয়া যায় না রাজনৈতিক সংযোগ না থাকলে। এ অবস্থায় ব্যবসা শুরুর জন্য সোলায়মানের কিছু অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু সেই অর্থটা কোত্থেকে আসবে, সে উপায় (চুরি ছাড়া) তার জানা নেই। তবে যে ব্যবসাটা শুরুর ইচ্ছা তার রয়েছে, সেটিও পুরোপুরি বৈধ নয়।
ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের একটি রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, আলজেরিয়ার ৩৫ অনূর্ধ্ব লোকদের (যারা মোট জনসংখ্যার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ) ২০ শতাংশই স্থায়ী কাজ খুঁজে পাচ্ছে না। আর সবচে’ বাজে অবস্থা তাদেরই, যারা সোলায়মানের মতো অশিক্ষিত এবং প্রথমবারের মতো শ্রমবাজারে যুক্ত হয়েছেন। আলজেরিয়ার অনেকে সোলায়মানের ভাইয়ের মতো বাধ্য হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে খনি ও কৃষিতে কাজ করতে। সেখানেও রয়েছে উচ্চ যুব বেকারত্ব। তবে তুলনামূলকভাবে সস্তায় কাজ করতে আগ্রহী থাকায় দক্ষিণ আফ্রিকায় আফ্রিকা মহাদেশের গরিব দেশগুলোর শ্রমিকদের চাহিদা বেশি। এ বছর আলজেরিয়ায় বেসরকারি খাতে মাত্র ১৮ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে, অথচ কাজ পেতে মরিয়া ৩ লাখ ৭০ হাজার তরুণ।
আলজেরিয়ায় গত দশ বছরের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ। আফ্রিকা ইকোনোমি আউটলুকের তথ্যানুসারে গ্যাস ও অন্যান্য খনিজসম্পদ আহরণ প্রকল্পগুলোয় এ বছর এখন পর্যন্ত কাজ পেয়েছে মাত্র ৩৮০০ শ্রমিক। বস্তুত দেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে খনিজ সম্পদ আহরণ চুক্তিগুলো সম্পাদন করতে পারেনি আলজেরিয়া। দেশটির প্রায় ১০ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। উচ্চ শিক্ষিত, কম্পিউটার ও ইংরেজিতে দক্ষ তরুণরাও সেখানে কাজ খুঁজে পাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তারা তুলনামূলকভাবে ‘ছোট’ কাজ বেছে নিচ্ছে। যেমনটি ঘটেছে ২২ বছরের তরুণ আব্দুল্লাহর বেলায়। বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট, ইংরেজি ও কম্পিউটারে দক্ষ, অথচ কাজ করতে হচ্ছে গাড়ি ধোয়ামোছার। জীবিকার প্রয়োজনে এ কাজ করলেও তাতে তিনি স্বস্তি পাচ্ছেন না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার যুব কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেসকা ডেলাভেল জানিয়েছেন, আলজেরিয়ায় কৃষি ও শিল্প উভয়ই উপেক্ষিত। বিদেশি সাহায্য ও খনি সম্পদের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দেশটি। খনিজ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের দেশে কীভাবে শিল্পের বিকাশ ঘটানো যায়, এ চিন্তা তাদের মাথাতেই নেই। কৃষির আধুনিকায়ন ঘটছে না বলে বাপ-দাদারা যেভাবে কাজ করেছেন, তরুণরাও ঠিক একইভাবে কৃষিতে শ্রম দিচ্ছে। আলজেরিয়ায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয় না বললেই চলে। মোদ্দাকথা কৃষি ও শিল্পের উন্নতি ঘটাতেই প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র লোকের সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারকে এ ব্যাপারে উদাসীন বলেই মনে হয়।
—আল জাজিরা ওয়েবসাইট অনুসরণে
