‘দেশের করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আমরা বাচুম না। কাজ চাই, আমরা তো ভিক্ষুক না, কাজ করে ভালো মজুরি চাই...’—করোনা মহামারিতে কাজ হারানো জহুরুল মিয়া (৫৫) এসব কথা বলেন।
জানা যায় পেশায় নির্মাণ-শ্রমিক ছিলেন তিনি। তবে করোনা মহামারিতে গত এক বছরে পেশা বদলিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন তিনি। তার এখন নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। যে কোনো কাজ হলেই হয় এবং কাজের বিনিময়ে ভালো মজুরি পেলেই তিনি সে পেশার মানুষ বলে পরিচয় দিতে চান নিজেকে। জহুরুল মিয়া বলেন, সব কাজ করতে পারি, কিন্তু শ্রম বাজারে কাজ নাই। প্রতিদিন বসে থাকি কাজের আশায় কিন্তু কাজ জোটে না। তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আরো অনেকে বলেন, ‘আমরা কাজ চাই...’।
করোনা আর লকডাউনের কারণে সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজ বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বড় অংশ কর্মহীন। ফলে বেশির ভাগ শ্রমিক কাজ হারিয়ে অসহায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে কাজ পেলেও মজুরি আগের চেয়ে অনেক কম। নির্মাণ-শ্রমিক হেলাল মিয়া জানান, লকডাউন শুরু হওয়ার পর বেশির ভাগ ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে তাদের অনেক সহকর্মী গ্রামে চলে গেছেন। অনেকে আবার তার মতো যারা আছেন তাদের আগের চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করতে হচ্ছে। তারপরও মাঝেমধ্যে কাজ না পেয়ে বসে থাকতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন বলছেন, দেশে করোনা ও লকডাউনের কারণে শ্রমজীবীদের জীবনমান শোচনীয় পর্যায়ে নেমেছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শ্রমিক শ্রেণির একটি বড় অংশ। পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। ক্ষতিগ্রস্ত দিনমজুর, কুলি, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণ-শ্রমিক, পর্যটন শিল্প-হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মী, নরসুন্দর, হকার শ্রেণির মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের হাজার হাজার শ্রমিক। দেশে শ্রমশক্তির একটা বড় অংশ রয়েছে এসব অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। তাদের না আছে কাজ, না আছে শ্রম আইনে কাজের স্বীকৃতি। কাজের জন্য শ্রমজীবী মানুষ দিন গুনছেন সুদিন ফেরার আশায়। নতুন করে ৩ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছে। পাটকল-চিনিকল বন্ধ করায় লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মচারী এখন বেকার। শ্রমিক-মজুরদের ঘরে ঘরে হাহাকার। তাদের জন্য বরাদ্দের টাকাও তারা ঠিকমতো পান না। অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে।

সম্প্রতি প্রকাশিত সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) ও বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাকালে দেশের শ্রমিকদের মাত্র ৮ শতাংশ সরকারের দেওয়া খাদ্য ও অর্থসহায়তা পেয়েছে। করোনার সময় কেবল শহরাঞ্চলে ১০ লাখ শ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও সুইডেনের ওয়েজ ইন্ডিকেটর ফাউন্ডেশন (ডব্লিউআইএফ) দেশের চারটি খাতের শ্রমিকদের নিয়ে একটি জরিপ করেছে। তাদের জরিপ অনুযায়ী তৈরি পোশাক, চামড়া, নির্মাণ ও চা, এই চার শিল্প খাতের শ্রমিকদের ৮০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন শ্রমিকের মধ্যে ৮০ জনেরই মজুরি কমেছে।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপে বলা হয়, করোনার গত এক বছরে দেশের ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কার ফলে এ হার আবারও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে তারা। জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক নইমুল আহসান জুয়েল বলেন, করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রায় সব খাতেই সাধারণ শ্রমিকদের আয় কমে গেছে। শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির উপযোগী বাজেটে প্রণয়ন করতে হবে। করোনা মহামারীতে বিদ্যমান টিকা কার্যক্রমে শ্রমজীবীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জাতীয় যুব শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম বলেন, সরকার প্রতিবছর বাজেটের আগে ব্যবসায়ী মহলসহ এফবিসিসিআই, এমপয়ার্স ফেডারেশন, বিভিন্ন চেম্বার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে থাকে। ব্যবসায়ী ও মালিকদের বিভিন্ন পরামর্শ ও সুপারিশ গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু দেশের উত্পাদন এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি শ্রমিক-কর্মচারীদের কোনো মতামত গ্রহণ করা হয় না। আমরা শ্রমিক প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণ এবং শ্রমজীবীদের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার কথাই বলব।
ইত্তেফাক/এএইচপি
