মাশরুম প্রকল্প কার জন্য?

আপডেট : ০৪ জুন ২০২১, ২১:২৫

মাশরুম চাষি ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ‘মাশরুম চাষের সমস্যা, সম্ভাবনা ও সমাধান’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, গবেষণা করে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও সিজন ভিত্তিক নতুন জাতের মাশরুম উদ্ভাবন করতে হবে এবং চাষ সম্প্রসারণ করতে হবে। মন্ত্রী মহোদয়ের এই আশাবাদকে মাশরুম সংশ্লিষ্টরা অবশ্যই সাধুবাদ জানাবেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় কার জন্য কে করবে এই গবেষণা? এর আগেও বিভিন্ন মেয়াদে বিভিন্ন প্রকল্পে জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। মাশরুম উন্নয়ন প্রকল্প ছিল উন্নয়ন প্রকল্পের মডেল। কৃষি বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের বড় কর্তারা খুশি, অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা খুশি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রফেসররা খুশি। কেউ খেয়ে খুশি, কেউ নিয়ে খুশি, কেউ এমনি-এমনিই খুশি।

আচ্ছা রবীন্দ্রনাথ কি কোনো উন্নয়ন প্রকল্প ভিজিট করেছিলেন? তাঁর লেখায় পাই—‘যদি জোটে রোজ/এমনি বিনি পয়সার ভোজ।/ডিশের পরে ডিশ/শুধু মটনকারি ফিস/সঙ্গে তারি হুইস্কি সোডা/দু-চার রয়াল ডোজ/পরের তহবিল/চোকায় উইলসনের বিল/থাকি মনের সুখে হাস্যমুখে/কে কার রাখে খোঁজ।’ রবীন্দ্রনাথ ঠিকই লিখেছেন, কেউ কারো খোঁজ রাখেনি। মাশরুম উদ্যোক্তা আর চাষির খোঁজ রাখার দরকার কী? মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট গবেষণার নামে উন্নয়ন কর্মকর্তা ও কতিপয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের বায়োডাটা প্রলম্বিত করেছে। উন্নয়ন প্রকল্পের কারিগরদের পিএইচডি ডিগ্রি দিয়ে বিনিময়ে কোনো কোনো প্রফেসর এখানে তাঁর গবেষণার বিষয়ে ল্যাবরেটরি তৈরি করতে উত্সাহিত করেছেন। এইসব ল্যাবরেটরি থেকে বাংলাদেশের মাশরুম উদ্যোক্তারা কিছু পাবেন না। অথচ সুবিধাভোগী প্রফেসর ক্ষমতাশীনদের খুব কাছে চলে যেতে পারেন। যেমন মাশরুম প্রকল্পের দুর্দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে আয়োজিত বোটানিক্যাল সোসাইটির কনফারেন্সে তত্কালীন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীকে প্রধান অতিথি করা হয়। কৃষিমন্ত্রী অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে অল্প সময়ের জন্য এলেও এক প্রফেসর তাঁর কানে মাশরুম প্রকল্পের সাফাই গেয়ে আবার প্রকল্প অনুমোদনের অনুরোধ জানান। কিন্তু বিধি বাম! সুবিধাবাদীদের খুব ভালো করে চেনেন অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী। মুুহূর্তেই প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি মাশরুম প্রকল্প নিয়ে অগ্নিঝরা বক্তব্য দেন। মঞ্চে উপবিষ্ট মাশরুমপ্রেমী প্রফেসর এবং মঞ্চের বাইরে মাশরুমের স্টল সাজিয়ে বসে থাকা মাশরুমের উপ-পরিচালক ও মাশরুম বিশেষজ্ঞ মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজে পাননি। এমন ঘটনা মন্ত্রণালয়েও নাকি ঘটেছে। দুর্নীতি ও নানাবিধ অপকর্মের কারণে মাশরুম উদ্যোক্তা ও চাষিদের তোপের মুখে নাজেহাল যখন মাশরুম প্রকল্প, এমনি সময়ে একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর সামনে বলে বসেন, ‘মাশরুম প্রকল্প তো বেশ ভালো করছে।’ মন্ত্রী নাকি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বলেছিলেন, ‘তাই নাকি! ওঁরা খুব খাইয়ে-টাইয়ে দিয়েছে আপনাকে, চেহারা তো জ্বলজ্বল করছে।’

ওভার ডোজে আপ্যায়ন, লাগামহীন কেনাকাটা, ভাউচার বাণিজ্য এবং মাশরুম উদ্যোক্তাদের প্রতি উদাসীনতায় মুখ থুবরে পড়েছিল জাতীয় মাশরুম প্রকল্প। পাঁচ বছর আগের গল্প এগুলো। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ছিয়াত্তর কোটি টাকা। প্রকল্পটি এ-টেবিল সে-টেবিল করে মন্ত্রণালয়ের সবুজ পাতায় পৌঁছে গিয়েছিল। মাননীয় কৃষিমন্ত্রী স্বাক্ষর করে দিলেই সেটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদনের জন্য যেত।

দুই দশক আগে রাঙামাটিতে মাশরুম প্রকল্প চালু হলে সেখানেও ব্যাপক দুর্নীতি হয়, রাঙামাটি ঢাকা থেকে অনেক দূরে ছিল বলে নাকি খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাহলে কৃষি বিভাগের নাকের ডগায় অবস্থিত সাভারের মাশরুম প্রকল্পের বেহাল অবস্থা কি অতিরিক্ত খোঁজখবর নেওয়ার কারণে হয়েছে!

একজন মাশরুমপ্রেমী হিসেবে আমি মাশরুম উন্নয়ন প্রত্যাশী। সত্যিকার অর্থেই যদি ভালো কাজের সুযোগ থাকে তবে সেটি হোক, নচেত্ সাধারণ মানুষকে মিথ্যা আস্ফাালনে প্রতারণা করা ঠিক নয়। প্রকল্পের নামে আবার কানার হাটবাজার যেন না বসে সেদিকে কৃষি বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা