শফিকুর রহমান রয়েল
করোনা মহামারি চলাকালীন এ সময়টায় যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে এরই মধ্যে বেশ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার ঢেলে ফেলেছে, আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে পথে হাঁটছেন, যদি ঐ পথেই থাকেন, তাহলে নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়, মার্কিন অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আগামী কয়েক বছরে আরো অনেক বেশি অর্থ ঢালা হবে। প্রণোদনা ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে অর্থ ব্যয় করার ক্ষেত্রে প্রায় পুরোটাই দৃষ্টিসম্পাত করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও যে নেহায়েত কম নয়, তা অর্থনীতিবিদরা ঠিকই দেখিয়ে দিতে পারছেন। এখানে এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝাতে গেলে বলতে হয়, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে প্রচুর অর্থ খরচ করার কারণে বাকি বিশ্বও ‘বাড়তি’ ফায়দা ভোগ করছে। ‘যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রত্যেককেই চেক প্রেরণ করছে,’ এমনই বলছিলেন পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের সিনিয়র ফেলো জোসেফ গ্যাগনন। খানা থেকে শুরু করে স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সব প্রকার সামগ্রী ক্রয় করছে। এসব করতে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এখানকার বিশাল বাজেট ঘাটতির মুখোমুখি আর কখনোই হতে হয়নি। অর্থনীতিতে আগের মতো গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চোখ বুজে ডলার বিলানো হচ্ছে। এমনকি বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি বলাও সম্ভব নয় যে, ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে আসা অর্থের কত শতাংশ ব্যয় করার বদলে সঞ্চয় করা হচ্ছে। তবে গ্যাগনন এ কথাটি স্বীকার করেছেন, প্রণোদনা ও পুনঃশক্তি অর্জনের লক্ষ্যে বরাদ্দকৃত অর্থের একটা বড় অঙ্ক ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবের নিশ্চয়তা দিতে পারে খুব সহজেই।
গ্যাগনন ব্যাখ্যাসহ দেখিয়ে দিয়েছেন, অর্থনৈতিক স্ফীতির সময় যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে মোট ব্যয়ের মধ্যে বহির্বিশ্ব উদ্দিষ্টের হার প্রবলভাবে বেড়ে যায়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটি থাকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। তার অভিমতে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বাড়তি ব্যয়ের ৩০ শতাংশের শেষ ঠিকানাটা হতে পারে বহির্বিশ্ব। চলমান বিশাল পরিমাণ ব্যয়ের স্তরকে তিনি ‘বিস্ময়কর গবেষণা’ বলে অভিহিত করেছেন। সার্বিকভাবে, এটি বিশ্বের জন্য কল্যাণকর এবং এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বস্তুত এমন অব্যাহত রাখাটা খুবই কঠিন। বিশাল অতিরিক্ত খরচের সমাপ্তি ঘটতে পারে রাজনৈতিক ইস্যু বনে গিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। যুক্তি ও পালটা যুক্তি উপস্থাপনের পর হয়তো অতিরিক্ত ব্যয়ের সলিলসমাধি ঘটবে, আর তা না হলে এর লাগাম টেনে ধরা হবে। এ ব্যাপরে অন্তত সন্দেহমুক্ত থাকা যায়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি ক্রমান্বয়েই বাড়ছে। খুব তাড়াতাড়িই এ প্রশ্ন উঠবে, ফেডারেল সরকার এই এতসব অর্থ কেন ধার দিচ্ছে চীন ও জার্মানির চাকরি সৃষ্টি ও এর সহযোগিতায়?
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব বোস্টন রিসার্চ ডিপার্টমেন্টের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও নীতি উপদেষ্টা ফ্যাক ব্রাউনিং জানিয়েছেন, অর্থনীতিবিদদের মধ্যে একটা ‘দৃঢ় ঐকমত্য’ রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত ব্যয়ের উপরি প্রভাব অন্য দেশসমূহের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, চলতি বছরে এসে দেখা যাচ্ছে, তারা তাদের অর্থনীতির বাজে অবস্থা কাটিয়ে সঠিক ট্র্যাকেই রয়েছে। বিশ্বের সর্ববৃহত্ অর্থনীতি ‘সঞ্চরণশীল শক্তি’ হয়ে অন্য অর্থনীতিগুলোকে তাদের পিছু পিছু টেনে তুলতে পারে। বর্ধিষ্ণু মার্কিন অর্থনীতির কাছে প্রত্যাশা করা হয়, অন্য দেশগুলোকে অর্থনৈতিক দুরবস্থা দ্রুত ও দৃঢ়ভাবে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বাণিজ্য সঙ্গীরা শক্তিশালী ও ইতিবাচক বাড়তি প্রভাবসমূহের দ্বারা উপকৃত হবে এটাই তো স্বাভাবিক। এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইতিমধ্যে এখন কিছুটা বাস্তবায়িতও হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো বেশি হবে। প্রমাণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত চাহিদার ওপর ভিত্তি করে জার্মানিতে দৃঢ় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঘটছে।
বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত ব্যয় থেকে অর্জিত লাভের স্তূপসমূহের কারণে স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপ ও এশিয়ার অন্য বৃহত্ অর্থনীতিগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি উপকৃত হবে। প্রতিবেশী মেক্সিকো ও সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে এমনিতেই বাণিজ্যিক বন্ধন দৃঢ়। এখন তাদের রপ্তানিতে ঘটবে আরো বলিষ্ঠ প্রবৃদ্ধি। বেশির ভাগ আয়ের ক্ষেত্রে যারা পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল, তারা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত ব্যয় থেকে এখন খুব একটা লাভের মুখ দেখবে না। তবে পর্যটন শিল্প তার আগের অবস্থানে পুরোপুরি ফিরে গেলে পর্যটননির্ভর দেশগুলোতে আমেরিকানরাই সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্ফীতি বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের জন্য কল্যাণকর হলেও এর মন্দ দিকও কিছুটা রয়েছে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট ইন ওয়াশিংটন-এর রেসিডেন্ট ফেলো ডেসমন্ড ল্যাচম্যান মনে করেন, বিশাল পরিমাণের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে আগামী বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অতিঘাতের শিকার হবে। এর ধকল সইতে হবে অন্যান্য দেশকেও। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অতিঘাতের পরিণতিতে সেখানকার সুদের হার উঁচুতে পৌঁছবে। এমন যখন ঘটে, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যারা অধিক মুনাফার আশায় বিদেশে বিনিয়োগ করেছে, তারা অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধার আশায় বিনিয়োগকৃত অর্থকে দেশে ফেরত নিয়ে আসতে মরিয়া হয়ে উঠে। যেমনটা যুক্তরাষ্ট্রে ঘটেছিল ২০১৩ সালে। মহামন্দার পর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে শুরু করেছিল নাটকীয়ভাবে।
—ভয়েস অব আমেরিকা অনুসরণে
