এই পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত কত রকম গোলমেলে ঘটনা ঘটছে, কত মানুষ কত রকম গোলমেলে উক্তি করছে, সেসব শুনলে আমরা বিস্মিত হই। সংশ্লিষ্ট পাত্র-পাত্রীকে নিয়ে অনেকে হাসাহাসিও করে। অনেক সময় নিজেরা টের পাই না যে, আমাদের অনুরূপ কথাবার্তা-কাজকর্মের জন্য অন্যেরাও আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করে। অবশ্য টের পেলেও খুব একটা লাভ নেই। আমরা অন্যের ব্যাপার নিয়ে অর্থাত্ পরচর্চায় যতটা উত্সাহী ও বেপরোয়া, নিজের ব্যাপারে বা আত্মচর্চায় ততটাই উদাসীন ও নিরুত্সাহী। কে কী বলল, কে কী করল—এসব নিয়ে এত বেশি মশগুল থাকি যে, নিজের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর আর সময় পাই না। এই যে আমাদের পরচর্চার অপ্রতিরোধ্য আসক্তি—এটিই সম্ভবত দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গোলমেলে ব্যাপার।
আমরা যেসব কথা বলি, যেসব কথা শুনি, সেসবের বেশিরভাগেরই কোনো বিষয়বস্তু নেই, কোনো মানেও নেই। তারপরও আমরা কথায় কথায় নানা কথা বলে ফেলি। অবশ্য মানে নিয়ে মাথা আর কে ঘামায়? সবাইকে যেন বিটিভির ৮টার সংবাদে পেয়েছে। কে শুনল আর কে শুনল না তাতে কিছুই যায় আসে না। তুমি শুনতে ভালোবাস কি না, তা আমি জানি না। আমার কাজ আমি করে যাব—এটাই যেন নীতি। তবে কথার মানে থাকুক বা না থাকুক, আমরা কিন্তু প্রতিনিয়ত কথা চালিয়ে যাই। কেউ বোবা হয়ে বসে থাকি না।
সবাই নিজ নিজ মতপ্রকাশ করে যাচ্ছি। এসব কথা নিয়ে মতান্তর আছে। অনেক ক্ষেত্রে মনান্তরও ঘটে। আমি-আপনি কোনো ভালো কথা বললেও তাকে পাত্তা দেওয়া হয় না। যদি বেশি হইচই করা হয় তাহলে বলা হবে, পাগলে কি না বলে আর ছাগলে...। কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি যখন কোনো সাধারণ কথাও বলেন, তা হয়ে ওঠে অসাধারণ, মূল্যবান। আমাদের দেশে ব্যক্তির গুরুত্ব বা ওজনের ওপর নির্ভর করে তার কথার দাম। গুরুত্বপূর্ণ লোক গুরুত্বহীন কথা বললেও তা হয় অত্যন্ত মূল্যবান; পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষ অতি দামি কথা বললেও সেটা ‘ফালতু বকবক’ হিসেবেই বিবেচিত হয়।
আমাদের এই বাচাল জাতিকে আরও বেশি ‘কথাবাগীশ’ বানাতে টেলিভিশনগুলো বিরাট ভূমিকা পালন করছে। এই টেলিভিশনগুলো সারা দিন সারা রাত শুধু বকবকানির অনুষ্ঠান চালায়। আগে টেলিভিশন চ্যানেলে রাত বাড়লে পরে বিভিন্ন রাগপ্রধান গানের অনুষ্ঠান হতো। এসব রাগ-রাগিনীর তালে মানুষ এক সময় ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যেত। এখন যুগ পাল্টেছে। শারীরিক শ্রম থেকে দেশের মধ্যবিত্তরা প্রায় অবসর নিয়েছে। এখন আর মানুষ আগের মতো ক্লান্ত হয় না। তা ছাড়া নানারকম স্বার্থচিন্তা, ধান্ধা-ফিকির ইত্যাদি মধ্যবিত্তদের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এই মানুষগুলোর রুচিও অনেকটাই পাল্টে যাচ্ছে। এখন মধ্যবিত্তরা রাত জেগে টেলিভিশনে বকবকানি শুনতে পছন্দ করে। সারা রাত যা শোনে, যা বোঝে, পরদিন সেগুলোর সঙ্গে নিজের মতো মিশিয়ে উগরে দেয়। এভাবেই চলছে বকবকানির চক্র।
গত এক দশকে আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তারা এক দল ‘সবজান্তা বাক্যবাগীশ’ লোককে খুঁজে বের করেছে। অধ্যবসায় এবং চর্চায় এরা খুব ভালো ‘বলোয়াড়’ হয়ে উঠেছেন (খেলতে খেলতে খেলোয়াড়, আর বলতে বলতে বলোয়াড়!), যে-কোনো বিষয়ে (এমনকি বিষয় ছাড়াও) ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারেন। এই বাক্যবাগীশরা নিজেরা যখন যে দায়িত্বে ছিলেন, তখন ভালো কিছু করতে না পারলেও কার কি করা উচিত—এ বিষয়ে গুরুতর সব মতামত ব্যক্ত করেন। তাদের বকবকানি শুনলে মনে হয়, আহা! এই লোকটা যদি আমাদের নেতা হতো! আহা, উনাকে যদি ওই দায়িত্বটা দেওয়া যেত!
যদিও এই মহামহিমরা যখন ভালো কিছু করার দায়িত্ব পান তখন আর ১০ জনের মতো শুধু লাভটা পকেটে ভরেন, আর যখনই উপদেশ দেওয়ার সুযোগ পান তখনই ‘দেবতা’ হয়ে যান। এমন ‘বলোয়াড়’দের তামাশা আর বকবকানিতে আমাদের জীবনটা বেশ রসেবশেই কাটছে। কথা না বাড়িয়ে আমরা বরং সরাসরি দুয়েকটা ‘গোলমেলে’ ব্যাপার সম্পর্কে আলোচনা করি। এখন কেমন বোধ করছেন—এ প্রশ্নের জবাবে এক ডাক্তার সাহেবকে রোগী জানিয়েছিলেন, এমনিতে কোনো কষ্ট আর নেই। শুধু নিঃশ্বাসের সময় বড় কষ্ট পাচ্ছি। এর জবাবে ডাক্তার সাহেব বলেছিলেন, এ নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। ও আমি শিগিগর বন্ধ করে দেব।
এই গোলমেলে প্রবোধ বাক্যে রোগী মহোদয় কতটা নিশ্চিত হয়েছিলেন, বলা কঠিন। শিগিগরই নিঃশ্বাসের কষ্ট বন্ধ হয়ে যাবে—এ আশ্বাসে তিনি নিশ্চয়ই ভাবিত হয়েছিলেন। আসলে কার কোন কথা বা কোন ঘটনা যে রসিকতার খোরাক হবে তা আগেই বলা যায় না। আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত অনেক ঘটনাই ঘটে, যা রসিকতার খোরাক হয়। কিন্তু সবাই সব সময় তা টের পায় না। এজন্য অবশ্য রসিক মন বা রসিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। জিনিসপত্রের দামের কথাই ধরা যাক। এই দাম বাড়ার ফলে আমাদের যে শুধু দুর্ভোগ-দুর্দশাই বাড়ছে, তা কিন্তু নয়। আমাদের অনেক উপকারও হচ্ছে। কিন্তু সে উপকারের খবর আর কে রাখে?
মধ্যবিত্তরা জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্যের কারণে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে। কিন্তু এর মধ্যেও যে কল্যাণ আছে তা আমরা কেউ তলিয়ে দেখছি না। ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে বলা যাক। এক রোগী তার রক্তে অধিক কোলস্টেরল সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। বেশ কিছুকাল চিকিত্সার পর রোগীর রক্তে কোলস্টেরল কমে যায়। রোগী অতঃপর ডাক্তার সাহেবকে ধন্যবাদ জানাতে চেম্বারে গেছেন। জবাবে ডাক্তার সাহেব বলেছেন, আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে লাভ নেই। জিনিসপত্রের দাম আগুন হয়েছে। এ অগ্নিমূল্যের জন্য আপনি আগের মতো তেল, ঘি, মাখন, মাছ, মাংস, ডিম বেশি বেশি কিনে খেতে পারছেন না। তাই স্বাভাবিকভাবেই আপনার শরীরে কোলস্টেরলের মাত্রা কমে গেছে।
অগ্নিমূল্যের সূত্রে এবার একটি গোলমেলে বিজ্ঞাপনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বর্তমান যুগ হচ্ছে বিজ্ঞাপনের যুগ, প্রচারেই প্রসারের যুগ। বর্তমানে অভিনব ভাষায় বিচিত্রসব বিজ্ঞাপন দেখা যায়। এক দোকানের বাইরের সাইনবোর্ডে নিম্নোক্ত বিজ্ঞাপনটি দেওয়া ছিল—‘তুলনামূলকভাবে কম দামে জিনিসপত্র কিনুন।’ সাধারণত এ ধরনের বিজ্ঞাপন নিয়ে বিশেষ কেউ মাথা ঘামায় না। অত সময়ই বা কার আছে? কিন্তু দুনিয়ায় চিন্তাশীল ভাবুক লোক এখনও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তেমনি একজন চিন্তাশীল খদ্দের জানতে চেয়েছিলেন, ‘কিসের সঙ্গে তুলনামূলক কম দাম?’ চতুর দোকানদার অত্যন্ত গম্ভীরভাবে জবাব দিয়েছিলেন, আগামী সপ্তাহের দামের সঙ্গে।
বাজার দর প্রতিদিন যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তাতে প্রত্যেক জিনিসের দাম আগামীকালের চেয়ে বা আগামী সপ্তাহের চেয়ে আজকে সস্তা বৈকি!
এ ধরনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ সম্প্রতি আরও এক ব্যক্তির মুখে শুনেছি। সব সময় সিরিয়াস এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে সেদিন কেমন আছেন জিজ্ঞেস করাতে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, খুব ভালো আছি। তার এ দৃঢ়তাপূর্ণ জবাব শোনার পর শুধিয়েছিলাম, চারদিকের যা পরিস্থিতি, তাতে এত ভালো থাকেন কী করে? তিনি আমাকে বিস্মিত করে জবাব দিয়েছিলেন, বলতে পারেন তুলনামূলকভাবে। আমি বাধ্য হয়ে বলেছিলাম, মানে? ভদ্রলোকের জবাব, গতকালের তুলনায় অবশ্যই খারাপ আছি, কিন্তু ভালো আছি আগামীকালের তুলনায়।
দিন দিন সত্যি সময় খারাপ হচ্ছে, আগামীকালের তুলনায় আমরা সবাই ভালো আছি। কথাটা একটু গোলমেলে হলেও সত্য। ভবিষ্যতের শঙ্কা আমাদের দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করছে। এ পরিস্থিতিতে আমরা সবাই যে বর্তমানে আগামীকালের চেয়ে আজ ‘তুলনামূলকভাবে’ ভালো আছি—তা অস্বীকার করার উপায় কী?
n লেখক : রম্যরচয়িতা
