ঢাকার আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসে পদে পদে কী যে দুর্ভোগ যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। নানা হয়রানির কারণে সাধারণ মানুষ দালালদের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়। আর্জেন্ট ফিস জমা দিয়েও দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়া দুষ্কর। তবে দালালদের কাছে এটা আবার খুবই সহজ। এই দালালচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের যোগাযোগ চোখে পড়ার মতো। দালালচক্রটি পাসপোর্ট অফিসে গড়ে তুলেছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট।
কিছুদিন আগে আমার মেয়ের পাসপোর্টে ডাকনাম প্রত্যাহারের জন্য কমপক্ষে ৫ দিন আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে যাতায়াতের বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা হয়েছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটের সঙ্গে পাসপোর্টের নাম ঠিক রাখতে গিয়ে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে দীর্ঘ কয়েকদিন এক ফোঁটা সেবা তো দূরের কথা, পদে পদে শুধু হয়রানি ছাড়া আর কিছুই পাইনি। প্রথমেই তথ্য কেন্দ্র থেকে বলা হয়, পাসপোর্টে কোনো সংশোধন আপাতত বন্ধ। যা হোক, পাহারারত দুর্ব্যবহারকারী আনসারদের ঠেলে ৬ তলায় পরিচালকের সঙ্গে দেখা করলে তিনি সংশোধনের ব্যাপারে ৩ তলার এক আপার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। আপা দেখা করতে রাজি হলেন না। তিন দিনেও পাসপোর্ট জমা দিতে না পেরে শুধু পরিচালক আর ঐ আপার উপর-নিচ অফিসে ঘুরতে ঘুরতে আমি নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সবশেষে পাসপোর্ট অফিসের ৬ তলায় পরিচালকের সঙ্গে কষ্ট করে দেখা করলে তিনি কিছু না বলে পাশের বিল্ডিংয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। সেখানে গিয়ে এডিজি-কে সিটে না পেয়ে অনেক অপেক্ষার পর তার পিএ-র কাছে আমার পরিচয় দিয়ে আপার ভিজিটিং কার্ড সংগ্রহ করি। পরের দিন মেয়েকে নিয়ে পাসপোর্টের আবেদন জমা দেই। আবেদনপত্র যিনি জমা নেন, তিনি মোবাইলফোনে কথা বলতে গিয়ে আর্জেন্ট ফিসের পরিবর্তে সাধারণ হিসেবে জমা নেন। পরে ভুল ধরে দিলে তিনি সেটা সংশোধনের জন্য আমাকে ৩০২ নং রুম থেকে ঠিক করে এনে পুনরায় তার কাছে জমা দিতে বলেন। এসব কারণেই মানুষ দালালদের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়।
তারপর আর্জেন্ট ফি জমা দেওয়ার পর পাসপোর্টপ্রাপ্তির ম্যাসেজ মোবাইলে না পাওয়ায় পাসপোর্ট অফিসের তথ্য কেন্দ্রে গেলে বলা হয়, এসবি রিপোর্টের জন্য বন্ধ। এবার নতুন করে আবার ভোগান্তি শুরু—৭০২ নম্বরে যেতে বলা হলো। সেখানে এই টেবিল ঐ টেবিল ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত উচ্চমান সহকারী পাঠান উপ-সহকারী পরিচালকের দপ্তরে, তিনি এবার পাঠান ৬০২ নং রুমে। সেখান থেকে ৭০২ নং রুমে আবার ৬০২ রুমে। সেখানে বলা হয়, প্রিন্টে পাঠাব। ম্যাসেজ পেলে পাসপোর্ট নিতে আসবেন। দুঃখের বিষয়, জরুরি ফিস দিয়েও আমার মেয়ের পাসপোর্ট এখনো হাতে এসে পৌঁছেনি। ১৪ জানুয়ারি পুরনো পাসপোর্টের ফটোকপিসহ আবেদন করা হয়, আবেদনের নম্বর ৪৭৮৬৩৪৪। এভাবে দেরি হওয়াতে মেয়ের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনাই বেশি। পাসপোর্ট অফিসের এ ধরনের বিষয়গুলো তদন্ত করা দরকার।
পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণের বিভিন্ন ধাপে দৌড়ঝাঁপ করে এই অভিজ্ঞতাই হয়েছে যে, পাসপোর্ট অফিসে কোনো সেবা নেই—হয়রানি পদে পদে। পাসপোর্ট ডেলিভারিতে ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন হলেও পাসপোর্ট জমার ক্ষেত্রে হয়রানি বেড়েছে। পুলিশ ভেরিফিকেশন বা আবেদনপত্রে সত্যায়নের নিয়ম চালু রাখায় সেবাগ্রহীতারা অহরহ হয়রানির শিকার হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশে পাসপোর্টের মেয়াদ ৫ বছরের পরিবর্তে ১০ বছর করার মধ্য দিয়ে সেবার মান বাড়ানো এবং পাসপোর্ট অফিসের অনিয়ম, হয়রানি দূর করতে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে আশা করছি। পরিশেষে, আর্জেন্ট ফি দেওয়া সত্ত্বেও আমার মেয়ের পাসপোর্ট এখনো পাইনি। প্রয়োজনে অভিযোগ তদন্ত করলে ভুক্তভোগীরা উপকৃত হবেন—তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ঢাকা
