মানব সভ্যতার সমৃদ্ধি এবং বিকাশে প্রকৃতি ও পরিবেশের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু প্রতিনিয়তই এই পরিবেশকে আমরা নানাভাবে দূষিত করছি। বিশ্ব জুড়ে পরিবেশ দূষণের মাত্রা এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। পরিবেশ হয়ে উঠছে বসবাসের অনুপযোগী এবং বিভিন্ন কারণে হচ্ছে দূষিত। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণও এর জন্য দায়ী। পরিবেশ দূষণের জন্য বিশেষভাবে দায়ী কিছু মারাত্মক রাসায়নিক দ্রব্য যেগুলোকে ডার্টি ডজন বলা হয়। এই ১২টি রাসায়নিক দ্রব্যের মধ্যে আটটি কীটনাশক যেমন :অলড্রিন ডায়েলড্রিন, ক্লোরডেন, এনড্রিন, হেপ্টাক্লোর, ডিডিট, মিরেক্স এবং টক্সাফেন রয়েছে। এগুলো পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এছাড়াও দ্রুতহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বৃক্ষ নিধন ও বনভূমি উজাড় , শিল্পকারখানার বর্জ্য, গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, অপরিকল্পিত গৃহনির্মাণ, মাত্রাতিরিক্ত প্লাস্টিক দ্রব্যের ব্যবহার ইত্যাদি পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। যার ফলে পরিবেশ তার নিজস্ব ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। পরিবেশ দূষণের জন্য পৃথিবীতে নিত্যনতুন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।
পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ প্রতি বছর ৫ জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসাবে পালন করে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং সমাধানের উপায় খুঁজতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালে ৫ জুন থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত মানবিক পরিবেশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনটি ইতিহাসের প্রথম পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের স্বীকৃতি পায়। ১৯৭৩ সালে ৫ জুনকে জাতিসংঘ বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং ১৯৭৪ সালে প্রথম এ দিবসটি পালিত হয়। এ থেকে প্রতি বছর দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। পৃথিবী ও প্রকৃতি রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে এ দিবসটি পালিত হয়। এ বছরে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার। কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের জীব সম্প্রদায় (উদ্ভিদ ও প্রাণী) নিজেদের মধ্যে এবং ঐ অঞ্চলের জড় বা অজৈব উপাদানের (জল, মাটি, বাতাস সূর্যালোক) ইত্যাদির সঙ্গে পারস্পরিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য উত্পন্ন উপাদানের বিনিময় ঘটায় তাকে বাস্তুতন্ত্র বলে। বাস্তুতন্ত্রকে তাই দেখা হয় জীব এবং তাদের পরিবেশের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার একটি শৃঙ্খল হিসেবে।
মানুষ নিজেদের স্বার্থে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করছে বাস্তুতন্ত্রে থাকা উদ্ভিদ ও প্রাণীদের। বর্তমান অন্ধকারময় পরিস্থিতিতে অতীত ফেরানো সম্ভব নয় ঠিকই কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতাকে সামনে রেখে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার করা। সে লক্ষ্যে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে বাস্তুতন্ত্র বিষয়টিকেই এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘ।
পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখায় বাস্তুতন্ত্রের ভূমিকা অপরিসীম। গাছ লাগিয়ে, শহরে সবুজায়ন করে, পরিকল্পিত উপায়ে বাগান পুনর্নির্মাণ, উপকূল ও নদীগুলো পরিষ্কার করে বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে। জাতিসংঘের মতে, কোনো একক দেশ বা প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। তাই সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে পরিবেশের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য। এছাড়াও পরিবেশ দূষণ রোধ ও বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে বৃক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানবদেহ থেকে নিঃসৃত বিষাক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড বৃক্ষ গ্রহণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তার একটি বাংলাদেশ। প্রতি বছর যত মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণজনিত রোগব্যাধির কারণে। কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন না করে সর্বত্রই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই বর্জ্য পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে মাটি এবং সাগরে। আবার সেই বর্জ্য পুড়িয়ে ক্ষতিকর ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। যা পরিবেশকে দিনকে দিন করছে বাসযোগ্যহীন। এছাড়াও খাদ্য উত্পাদন সুবিধার জন্য যে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হচ্ছে তা মাটির ক্ষতি করেছে। মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে উত্পাদন হ্রাস করছে। প্রতিনিয়তই মানুষের প্রয়োজন মেটাতে এভাবে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার মাধ্যমে একটি নতুন সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসলে পরিবেশ হয়ে উঠবে নির্মল ও সুন্দর।
n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

