অসাম্প্রদায়িকতাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি

আপডেট : ০৫ জুন ২০২১, ২২:১৩

বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম একটি স্তম্ভ হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। বিভিন্ন সময় এই ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটিকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। অনেকের ধারণা, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের অনুপস্থিতি, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা, এরকম অপপ্রচার বিভিন্ন সময় ছড়ানো হয়েছে। কিন্তু আসলেই কী তাই? নাকি ধর্মনিরপেক্ষতা মানে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নৈরাজ্য সৃষ্টির পথ বন্ধ করা। 

প্রকৃতপক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কিন্তু ধর্মহীনতা নয়, বরং ধর্মনিরপেক্ষতা মানে একটা সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে সবাই মিলেমিশে থাকা, স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করা। বিশেষ করে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে এর গুরুত্ব আরো বেশি। কারণ, মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়কে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। আর এই জাতীয়তাবোধ সৃষ্টির পেছনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক অসাম্প্রদায়িক চেতনা কাজ করেছে। পরবর্তীতে এই অসাম্প্রদায়িকতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে স্বাধীন বাংলাদেশ। 

সেদিকে যাওয়ার আগে, রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে ধর্মের সম্পর্কটা কেমন- সেই বিষয়ে একটু ভেবে দেখা যাক। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বা ধর্মনিরপেক্ষতা: সবই আসলে রাজনৈতিক ধারণা। এর সঙ্গে ব্যক্তি মানুষের ধর্ম বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নাই। ব্যক্তি অধার্মিক হয়েও রাজনীতির মঞ্চে ধর্মের ধুয়ো তুলতে পারেন। আবার উল্টোটাও হয়। অখণ্ড ভারতে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো মহান মুসলিম নেতা ছিলেন, যিনি ব্যক্তিগত জীবনে আপাদমস্তক ইসলাম মেনে চলতেন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র চাননি। আবার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, যাকে পাকিস্তানের জনক বলা হয়, তিনি বিলেতি স্টাইলের জীবনযাপন করেও কিন্তু একটা ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হয়েছেন।

No description available.

আবার দেখুন, ইরাকের একজন খ্রিস্টানও কিন্তু তার পরিচয়ের সময় বলেন- ইরাকি, তিনি কিন্তু খ্রিস্টান বলেন না। জাতিগতভাবে তিনি ইরাকি, এটাই তার বড় পরিচয় মনে করেন তিনি। ঠিক তেমনি বাংলাদেশের নাগরিকরাও যেনো হাজার বছরের সম্প্রীতির সংস্কৃতিকে ধারণ করে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শান্তিপূর্ণ এক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলে, সেই প্রয়াস থেকেই স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে ধাবমান হয় বাংলাদেশ। 

ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পরপরই মোহভঙ্গ 
১৯৪৭ সালে শুধু ধর্মের ভিত্তিতেই পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয় পূর্ব বাংলা, পরবর্তীতে এই ভূখণ্ডকে পূর্ব পাকিস্তান বলে অভিহিত করা হয়। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজদের কিছু বিভেদমূলক নীতির কারণে, সেই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে চেয়েছিল মুসলমানরা। সেসময় তাই ধর্মভিত্তিক একটা জাতীয়তাবোধ জাগ্রত হয়, যার ফলে জন্ম হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তানের দাবিতে শতকরা ৯৭ শতাংশ ভোট দেয় এই বাংলার মানুষ। অথচ দেশ ভাগের পরেই বদলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের আচরণ। অল্প সময়ের মধ্যেই পূর্ব বাংলার লোকজন বুঝতে পারেন যে, ইসলামের ছদ্মবেশে পশ্চিম পাকিস্তানিরা আসলে এই অঞ্চলের মানুষের বড় ধরণের ক্ষতি করে ফেলেছে। রাষ্ট্রের সাইনবোর্ডে ইসলাম ধর্মকে রাখা হলো ঢাল হিসেবে, কিন্তু রাষ্ট্রপরিচালনায় ইসলামের ‘ই’-ও রাখা হলো না। শুরু হলো শোষণ, বৈষম্য, নির্যাতন। 

ব্যাস, পাকিস্তানিদের ধর্মের লেবাসটা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকলো সাধারণ মানুষের সামনে। এরপর শোষণহীন জীবনের দাবিতে একাট্টা হতে থাকলো তুমুল শোষণে ক্লান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। ধর্ম-বর্ণ নির্বেশেষে এক নতুন জাগরণ শুরু হলো। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ কর্তৃক উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পর ঢাকায় যে প্রতিবাদ শুরু হয়, ১৯৫২ সালের তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে তা এক নতুন জাতীয়তাবোধে জাগরিত করে তোলে জাতিকে। অসাম্প্রদায়িকতাই এই ছিল এই জাগরণের মূল ভিত্তি। এই ধর্মনিরেপক্ষতার ভিত্তির ওপরেই দাঁড়িয়ে যায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ। যার ফলশ্রুতিতেই শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজের দাবি নিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের।  

ছোট্ট একটা উদাহরণ দিলেই এই অল্প সময়ের ব্যাধানে মানুষের মনোভাব পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময় প্রবল পরাক্রমশালী মুসলিম লীগ আবারো ধর্মকে হাতিয়ার করে মাঠে নামে। এর বিপরীতে- মানুষকে বৈষম্যহীন জীবন, শোষণমুক্ত সমাজ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতিশ্রুতি দেয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট। ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যেখানে ৯৭ শতাংশ আসনে মানুষ ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দিয়েছিল, সেখানে মাত্র কয়েক বছরের মাথায় সেই ধর্মের ফেরিওয়ালাদের শূন্য হাতে বিদায় করেছে সেই মানুষেরাই। 

No description available.

বাংলার ২৩৭টি মুসলিম আসনের বিপরীতে মুসলীম লীগ মাত্র ৯টিতে জয়লাভ করে। বাকি ২১৫ আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট। স্বতন্ত্র হিসেবে জিতে আসা ৮ জনও পরে যুক্তফ্রন্টে যোগ দেন। মাত্র অর্ধযুগের ব্যবধানে, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের মোহ কাটিয়ে মানুষ মানবতাভিত্তিক-মর্যাদাভিত্তিক রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হতে চেয়েছে। 

১৯৫৪ সালের পর থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন পর্যন্ত বাংলাদেশে আর কখনোই সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ৮০ শতাংশ মুসলমানের এই দেশের মানুষ আর ধর্মের ফাঁদে ফেলতে চায়নি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে। গণমানুষের সর্বমুখী আকাঙ্ক্ষার রায় যায় একটি অসাম্প্রদায়িক মানবিক রাষ্ট্র গড়ার পক্ষে। যে আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে জাতীয়তাবাদ পূর্ণতা লাভ করে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ফলে স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে সংবিধানের চার স্তম্ভের অন্যতম একটি বলে ঘোষণা দেন। 

বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে অসাম্প্রদায়িকতার পথে যাত্রা 
স্বাধীনতার পর প্রথমেই একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নে হাত দেন বঙ্গবন্ধু। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনি পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন একটি ব্যবস্থার দিকে যেতে চাইলেন। বঙ্গবন্ধু চেয়েছেন, বাংলাদেশ হবে এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে সব মানবাধিকার নিশ্চিত করা হবে। এজন্য হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বহু ধর্ম-বর্ণের এই জাতিকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সম্প্রীতির বন্ধনে বাঁধলেন তিনি। রাষ্ট্রের অন্যতম একটি মূল নীতি হিসেবে ঘোষণা করলেন ধর্মনিরপেক্ষতাকে। ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যাও তিনি সেসময় দিয়েছেন। এটি নিয়ে ভ্রান্তি ছড়ানোর কোনো অবকাশ নেই।   
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদের ভাষণে এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমাদের আপত্তি শুধু এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। পঁচিশ বছর আমরা দেখেছি- ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানি, ধর্মের নামে অত্যাচার, এই বাংলাদেশের মাটিতে এসব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষার করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

No description available.

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বঙ্গবন্ধু নিজে তরুণ বয়সে কিন্তু একসময় শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দীদের সঙ্গে পাকিস্তান চেয়েছেন। এমনকি পাকিস্তান চেয়ে যারা আন্দোলন করেছেন, তাদের মধ্য বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ধর্মকে পাকিস্তানিরা যেভাবে ব্যবহার করেছে, তা বুঝতে পেরে হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। এবং সেই তখন থেকেই অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্য কাজ শুরু করেন। 

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টির পর আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে, সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু মেনিফেস্টো থাকবে।’

কিন্তু পাকিস্তানিরা যখন উর্দুকে ইসলামি ভাষা বলে চাপিয়ে দিতে চাইলো আমাদের ওপর, ১৯৪৮ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই ঘোষণা দিলেন, তখন নিজে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে এর প্রতিবাদ করেন তরুণ শেখ মুজিব। 

No description available.

পরবর্তীতে জেলে থাকা অবস্থায় ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে। আরব দেশের লোকেরা আরবি বলে। পারস্যের লোকেরা ফার্সি বলে। তুরস্কের লোকেরা তুর্কি বলে। ইন্দোনেশিয়ার লোকেরা ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় কথা বলে। মালয়েশিয়ার লোকেরা মালয় ভাষায় কথা বলে। চীনের মুসলমানরা চীনা ভাষায় কথা বলে। শুধু পূর্ব পাকিস্তানের ধর্মভীরু মুসলমানদের ইসলামের কথা বলে ধোঁকা দেওয়া যাবে বলে ভেবেছিল, কিন্তু পারে নাই।’ 

পাকিস্তান পর্বে যেসব বিষয়কে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবেদের বিকাশ ঘটে তার মধ্যে অন্যতম হলো: বৈষম্য ও শোষণমুক্তি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠান জন্য সংগ্রাম এবং অসাম্প্রদায়িকতা। যে কারণে, ১৯৫৪ এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় হয় এবং ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ ‘আওয়ামী লীগ’-এ রূপান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন এই দলটি। ষাটের দশকে এই অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবোধ আরো তীব্র হয়ে ওঠে ছয় দফার মধ্য দিয়ে। এর মূল দাবি ছিল মূলত সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বশাসনের। কিন্তু এর ভাবাদর্শগত ভিত্তি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যার শেকড় অসাম্প্রদায়িকতার মধ্যে প্রোথিত। 

তৎকালীন সময়ে ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’, ‘জাগো জাগো, বাঙালি জাগো’, ‘জয় বাংলা’... এসব শুধু স্লোগান ছিল না। এসব মন্ত্রের মাধ্যমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির মানসলোকে অসাম্প্রদায়িকতার বন্ধন রচিত হয়েছে। 

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে সব ধর্মের মানুষের মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা 
ঐতিহ্যবাহী এক মুসলিম পরিবারে ১৯২০ সালে  জন্ম শেখ মুজিবুর রহমানের। এরপর বেড়ে উঠেছেন নিজ এলাকা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। মূলত কিশোর বয়স থেকেই তিনি প্রভাবিত হন তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশ দ্বারা। নিজের ছোটবেলার ব্যাপারে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘তখন স্বদেশী আন্দোলনের যুগ। মাদারীপুরের পূর্ণ দাস তখন ইংরেজদের আতঙ্ক। স্বদেশী আন্দোলন তখন মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের ঘরে ঘরে। আমার মনে হতো মাদারীপুরে সুভাষ বোসের দলই শক্তিশালী ছিল।’ 

No description available.

সেই সময়টাতেই ইংরেজদের প্রতি বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয় কিশোর শেখ মুজিবের মনে। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি ভেবেছেন, ‘ইংরেজদের এদেশে থাকার কোনো অধিকার নাই। স্বাধীনতা আনতে হবে।’ 

বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা জীবনী থেকে আরো জানা যায়, ১৯৩৭ সালে তাকে পড়াতেন হামিদ মাস্টার নামের একজন, যিনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা। আবার মাদারীপুরের পূর্ণ দাস তখন বেশ সুপরিচিত। ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের কারণে জেলও খাটেন। তাকে নিয়ে ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ নামে একটি কবিতা লিখে পাঠান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। 

হিন্দু-মুসলিম বিভেদ নয়, বরং একসঙ্গে মিলেমিশে অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এই শিক্ষা তিনি কৈশোরের এসব ঘটনা থেকেই পেয়েছেন। প্রথমে স্বদেশী আন্দোলন ও পরে সুভাষ বোসের প্রতি টানের কারণেই জীবনের শুরু থেকেই সাম্প্রদায়িকতা পরিত্যাগ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তাই তার মানসপটে ধীরে ধীরে লেখা হচ্ছিলো মনুষ্যত্বের জয়গান।  

পরবর্তীতে, ১৯৩৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যখন গোপালগঞ্জে যান, তখন শেখ মুজিবকে মুসলিম ছাত্রলীগের যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান সোহরাওয়ার্দী। ১৯৪০ সালে শেখ মুজিব নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের বেকার হোস্টেলে থাকার সময় পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এরপরও ধর্মীয় গোঁড়ামি বা উগ্র সাম্প্রদায়িকতা তাকে কখনোই গ্রাস করেনি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় কলকাতার দাঙ্গা প্রতিরোধে তার ভূমিকা ছিল অনবদ্য। কাছে থেকে দেখেছেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার বর্বরতা, মানুষের আহাজারি। ছুটে গিয়েছেন আর্ত মানবতার সেবায়। 

No description available.

এখানে উল্লেখ্য যে, এই উপমহাদেশের অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ যখন ইংরেজদের কারণে ক্রমেই নষ্ট হওয়ার মুখে, তখনও অনেকে উদ্যোগ নিয়েছিলেন এটি টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু ইংরেজদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির কারণে তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তানিরাও ধর্মের ঢাল ব্যবহারের চেষ্টা করেছে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অদম্য নেতৃত্ব এবং তার প্রতি বাংলার মানুষের আস্থার কারণে পাকিস্তানিদের ধর্মের ট্রামকার্ড ব্যর্থ হয়েছে। 

ইতিহাসের মহাসড়কে মুসলিম লীগের রাজনীতি দিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, কালের আবর্তনে ধীরে ধীরে তিনিই হয়ে ওঠেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারক ও বাহক। এজন্য বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিণত করতে ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের প্রধান এবং প্রথম শর্তও ছিল এটি। বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে বোঝায়- অসাম্প্রদায়িকতা, রাজনীতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার রোধ ও ধর্ম সংক্রান্ত ব্যাপারে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা। এক কথায়: ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। 

ইত্তেফাক/এসজেড