অনিন্দ্য সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) পাখির অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশের কারণে দিন দিন এই ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য্য বাড়ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাম্পাসে বর্তমানে ২১৫ প্রজাতির পাখি বাস করছে। এছাড়াও আগামী চার বছরের মধ্যে ক্যাম্পাসে চার শতাধিক গাছের সংগ্রহশালা তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে চবিতে পাখির প্রজাতি ছিল ৭৯টি। কিন্তু ২০১৭ সালে ক্যাম্পাসে পরিচালিত এক গবেষণায় নতুন ১৩৬ প্রজাতির পাখি রেকর্ড করা হয়। পাখি নিয়ে পরিচালিত এই গবেষণা ইতিমধ্যে ভারতের থ্রেটেন্ড টেক্সা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোঃ ফরিদ আহসান, মোঃ তারিক কবির, মোঃ মিজানুর রহমান ও মোঃ মনিরুল ইসলাম এই গবেষণা পরিচালনা করেন।
অধ্যাপক ফরিদ আহসানের গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পাখির ওপর চালানো আরেকটি জরিপে ১১ বর্গের ৩১ গোত্রের ৯২ প্রজাতির পাখি রেকর্ড করা হয়েছিল। এসব প্রজাতির মধ্যে ৩৮টি ছিল অগায়ক এবং ৫৪টি ছিল গায়ক প্রজাতির। এদের মধ্যে ৭৬টি স্থায়ী প্রজাতি এবং ১৬টি পরিযায়ী প্রজাতি হিসেবে সে সময় শনাক্ত করা হয়।
২০১৭ সালে অধ্যাপক ফরিদ আহসান পাখির ওপর সর্বশেষ জরিপটি পরিচালনা করেন। তাতে তিনি ২১৫ প্রজাতির পাখি রেকর্ড করার কথা জানিয়েছেন। এরমধ্যে গায়ক প্রজাতি রয়েছে ১০৮টি, আর অগায়ক প্রজাতি রয়েছে ১০৭টি। এরমধ্যে ১৬০ প্রজাতির পাখির স্থায়ী নিবাস চবি ক্যাম্পাস। আর পরিযায়ী পাখি হিসেবে বিভিন্ন মৌসুমে ক্যাম্পাসে আসে ৫১ প্রজাতির পাখি। চারটি প্রজাতি আছে, যারা মাঝে-মধ্যে ক্যাম্পাসে আসে। এসব পাখির মধ্যে বেশকিছু দুর্লভ প্রজাতির পাখিও রয়েছে। যাদের মধ্যে রয়েছে- মথুয়া, পিটা, গ্রিন ম্যাগপাই, কানাকুয়া, মালকোহা, রেড হেডেড ট্রাগল ও রুপাস নেকড লাফিং প্রাস।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক গাজী সৈয়দ মোহাম্মদ আসমত জানিয়েছেন, মূলত বিপুল পরিমাণ বৃক্ষরোপণের কারণেই ক্যাম্পাসে পাখির প্রজাতি বাড়ছে। উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ এবং বন ও পরিবেশ বিদ্যা ইনস্টিটিউট ছাড়াও আশপাশে স্থানীয়রাও প্রচুর গাছ লাগিয়েছেন। ইতিমধ্যে ওয়ার্ল্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউট (ডব্লিউআরআই) ইন্দো-বার্মা বায়োডাইভারসিটি এ ক্যাম্পাসকে প্রাণির ‘হট স্পট’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। পাহাড়ঘেরা এই ক্যাম্পাসে পাখির পদচারণা বাড়লেও বণ্যপ্রাণির সংখ্যা দিন দিন কমছে। তবে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে গাছের প্রজাতি। গত ১৮ বছরে ১৯২ প্রজাতির গাছ বেড়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
২০১০ ও ২০১৬ সালে গাছ ও সপুষ্পক উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা করেন বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন, মোহাম্মদ সফিউল আলম ও মোঃ আকতার। তাদের গবেষণা বলছে, ১৯৫০ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অঞ্চলে গর্জন, বৈলাম, পাদাউক, আগর, তমাল, ধূপ, ত্রিশূলের মতো গাছের আধিক্য ছিল। কালের পরিক্রমায় এসব গাছ ক্যাম্পাস থেকে হারিয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এখানে আগামী চার বছরের মধ্যে চারশ’ প্রজাতির গাছ লাগানো হবে। গবেষণায় জানানো হয়েছে, ১৯৯৯ সালের দিকে ক্যাম্পাসে গাছ ছিল ৫৯ প্রজাতির। ২০০৬ সালে সেটা বেড়ে ১৭৫ প্রজাতি হয়। সর্বশেষ গবেষণায় ২৫৫ প্রজাতির গাছ রেকর্ড করা হয়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, ১৯৭৫ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় বোটানিক্যাল গার্ডেন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর কিছু কিছু গাছ লাগানো হয়। ১৯৮২ সালে বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে রাস্তার পাশে, ক্যাম্পাসের খালি জায়গায় ও পাহাড়ের ঢালে শতাধিক প্রজাতির গাছ লাগানো হয়।
অধ্যাপক কামাল হোসাইন জানিয়েছেন, আগামী চার বছরের মধ্যে ৪শ প্রজাতির গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ৫ বছরের মধ্যে চবিকে দেশের বৃহত্ গাছ সংগ্রহশালায় পরিণত করার জন্য কাজ চলছে।
