ঐতিহ্যের পিঠা...

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৩৫

 ‘ইশ! সেই ছোটবেলার রসের পিঠার স্বাদ যেন মুখে লেগে আছে।’- প্রবীণরা যখন এ ধরনের কথা বলেন, এখনকার ছেলেমেয়েরা সেসব শুনে হাসে। হাসবারই কথা! এই ফাস্ট ফুডের যুগে পিঠার সেই রকমারি স্বাদ সেভাবে তো পায়নি এখনকার প্রজন্ম, বিশেষ করে যারা বড় বড় শহরে থাকে। তারপরও একেবারে হারিয়ে যায়নি বাংলার পিঠা। ফাস্টফুডের মতই শহরের দোকানগুলোতে উঠে এসেছে পিঠা। ভাপা পিঠা তো শীতের সময় রাস্তার মোড়ে মোড়ে মেলে। আর নানা উপকরণ দিয়ে চিতই পিঠা খাওয়ার চলও নাগরিক জীবনে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু কত শত রকমের পিঠা যে রয়েছে তার খোঁজ কী এই শহরে বসে পাওয়া যায়!

‘পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশিতে বিষম খেয়ে

আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।’

কবি সুফিয়া কামালের কবিতায় গ্রাম বাংলার কিশোর বয়সের পিঠা খাওয়ার আনন্দ ধরা পড়ে এইভাবে।

সাধারণত নতুন ধান ওঠার পরে আতপ চালের গুড়া দিয়ে তৈরি হয় পিঠা। সব ঋতুতেই পিঠা তৈরি হয়। তবে শীতে খেজুর গুড় ও খেজুরের রসে ভেজা পিঠার স্বাদ ভোলা যায় না। সে জন্য শীতকালেই রকমারি পিঠা রয়েছে আমাদের সংস্কৃতিতে।

পিঠার নকশাগুলো খুব আকর্ষণীয়। নকশি পিঠা আমাদের লোকশিল্পের অংশ। গ্রামের নারীদের শিল্পবোধের পরিচয় তুলে ধরে পিঠার নকশা।

লোকজ ফর্ম নিয়ে কাজ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক শিল্পী শাবিন শাহরিয়ার। তিনি বললেন, গ্রামে জামাই এলে বা মেয়েরা বাড়িতে এলে পিঠা বানানোর রীতি রয়েছে। দেখা যায় এসব পিঠার আকৃতিতে ফুটে ওঠে প্রকৃতির নানা উপকরণ যেমন, মাছ, পান, কুলা, ফুল ইত্যাদি। নকশী পিঠার ক্ষেত্রে ফুল ও আলপনার কাজ প্রাধান্য পেয়ে এসেছে ঐতিহ্যগতভাবে। এসব পিঠা বানানোর যে ছাঁচ সেগুলো গ্রাম বাংলার মেয়েরা নিজেরাই তৈরি করেন। কুশলী পিঠার ফর্ম তো আধখানা চাঁদের ফর্ম। এই ফর্মগুলো নিয়ে মেয়েরা তাদের নকশী কাঁথাতেও সুঁই-সুতোয় ফুটিয়ে তোলেন। আবার শেকড় সন্ধানী শিল্পীরা সেই ফর্মগুলোকে নিয়ে নতুন ফর্ম তৈরি করে। আমি এই ধরনের নকশী পিঠার ফর্ম নিয়ে কাজ করেছি। বাংলাদেশের পিঠা লোক ধারা এবং শিল্পের ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী ফর্ম। বাংলাদেশকে চেনার জন্য উল্লেখযোগ্য একটি উপকরণ।

পিঠা বেঁচে আছে নাগরিক মেলায়

পিঠা লোক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই, একে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। হারিয়ে যেতে দেয়া চলবে না। আর সে কারণেই রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে পিঠা মেলার আয়োজন বসে। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের পিঠার সঙ্গে পরিচয় নেই বললেই চলে। সে পরিস্থিতি বিবেচনা করেই কয়েক বছর ধরে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে আয়োজন করা হচ্ছে পিঠা উত্সবের। শিল্পকলা একাডেমির সবুজ চত্বরে গত ১২ বছর ধরে নিয়মিতভাবেই বসেছে পিঠা উত্সব।

পিঠা উত্সব উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব খন্দকার শাহ আলম বললেন, ২০০৮ সালে যখন দেশে সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্থবির তখন পিঠা উত্সবের আয়োজন করা হয়। শিল্পকলা একাডেমির সবুজ প্রাঙ্গণে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় শুরু করা সেই উত্সব আট বছরে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। এখন দল বেঁধে মানুষ আসে এ উত্সবে। তিনি জানান, শুধু উত্সব আয়োজনই নয়, যাতে মেয়েদের মাঝে পিঠা তৈরির আগ্রহ সৃষ্টি হয় সেজন্য প্রতিবছর সেরা কয়েকজন শিল্পীকে পুরস্কৃত করা হয়। এবছরও জানুয়ারির শেষ দশদিন ধরে শিল্পকলা একাডেমি প্রঙ্গণে বসেছিল পিঠা মেলা।

নানা রকমের পিঠা

পিঠার মূল মৌসুম শুরু হয় হেমন্তে, যখন কৃষকরা ঘরে ধান তোলে। প্রত্যেক এলাকায় আলাদা ধরনের পিঠা রয়েছে। আবার একই পিঠা এলাকাভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। এমন কিছু পিঠা আছে যা সারাদেশেই প্রসিদ্ধ এবং জনপ্রিয়। এগুলো হচ্ছে ভাঁপা পিঠা, ঝাল পিঠা, ছাঁচ পিঠা, ছিটকা পিঠা, চিতই পিঠা, দুধ চিতই, বিবিখানা, চুটকি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, চাঁদ পাকান পিঠা, ছিট পিঠা, সুন্দরী পাকান, সরভাজা, পুলি পিঠা, পাতা পিঠা, পাটিসাপটা, পাকান পিঠা, পানতোয়া, মালপোয়া, মেরা পিঠা, মালাই পিঠা, মুঠি পিঠা, আন্দশা, কুলশি, কাটা পিঠা, কলা পিঠা, খেজুরের পিঠা, ক্ষীর কুলি, গোকুল পিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, লবঙ্গ লতিকা, রসফুল পিঠা, জামদানি পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, ঝালপোয়া পিঠা, ঝুরি পিঠা, ঝিনুক পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, নকশি পিঠা, নারকেল পিঠা, নারকেলের ভাজা পুলি, নারকেলের সেদ্ধ পুলি, নারকেল জেলাফি, তেজপাতা পিঠা, তেলের পিঠা, তেলপোয়া পিঠা, দুধরাজ, ফুল ঝুরি পিঠা, ফুল পিঠা, বিবিয়ানা পিঠা, সেমাই পিঠা প্রভৃতি।

পিঠা তৈরির সাধারণ উপাদান হচ্ছে চালের গুঁড়া, ময়দা, গুড় বা চিনি, নারকেল ও তেল। অনেক সময় কিছু কিছু পিঠাতে মাংস ও সবজি ব্যবহার করা হয়। যেমন সবজি পুলি, সবজি ভাপা, ঝাল কিংবা মাংস পাটিসাপটা। কোনো কোনো সময় কাঁঠাল, তাল, নারকেল, কলা ইত্যাদি ফল দিয়েও পিঠা বানানো হয়। ঐসব পিঠায় ব্যবহার করা ফলের নামেই সে পিঠার নাম দেয়া হয়। পাতায় মুড়িয়ে এক ধরনের বিশেষ পিঠা তৈরি হয়, যাকে পাতা পিঠা বলা হয়। কিছু কিছু পিঠার আকার অনুযায়ী নামকরণ করা হয়। যেমন বড় ধরনের পিঠাকে হাঁড়ি পিঠা এবং ছোট আকৃতির এক ধরনের পিঠাকে খেজুর পিঠা বলা হয়।

বিয়ের সময় নতুন বরকে বরণ করা উপলক্ষে কারুকার্যখচিত, বর্ণাঢ্য ও আকর্ষণীয় নানা রকমের পিঠা তৈরি হয়। এ ধরনের পিঠার নাম বিবিয়ানা অর্থাত্ বিবি বা কনের পারদর্শিতা। এ ধরনের পিঠাকে জামাই ভুলানো পিঠাও বলা হয়।

নকশি পিঠা তৈরির জন্য প্রথমে আতপ চালের গুঁড়া বা আটা সেদ্ধ করে কাই করা হয়। এ কাই বেলে রুটি করে তার উপর গাছ, লতা-পাতা ইত্যাদির নকশা তোলা হয়। খেজুর কাঁটা, খোঁপার কাঁটা, সূচ, পাটকাঠি ইত্যাদির সাহায্যে হাতে দাগ কেটে-কেটে নকশাগুলো তোলা হয়। হাতের পরিবর্তে ছাঁচের সাহায্যেও পিঠাকে নকশাযুক্ত করা যায়। ছাঁচগুলো সাধারণত মাটি, পাথর, কাঠ বা ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি। এসব ছাঁচের ভিতরের দিকে গাছ, ফুল, লতা, পাতা, মাছ, পাখি প্রভৃতির নকশা আঁকা থাকে।

জনপ্রিয় কিছু মোটিফ, যেমন পদ্ম, বৃত্ত ইত্যাদিও পিঠার নকশায় ব্যবহূত হয়। এছাড়া কখনও কখনও নকশি পিঠার গায়ে ‘শুভ বিবাহ’, ‘গায়ে হলুদ’, ‘সুখে থেকো’, ‘মনে রেখো’, ‘কে তুমি’, ‘ভুলোনা আমায়’ প্রভৃতি লেখার ছাপ দেওয়া হয়।

সব ধরনের পিঠায় নকশা আঁকা হয় না। সাধারণত পুলিপিঠা ও পাকোয়ান বা তেল পিঠা, যাকে ফুল পিঠাও বলে, তাতে নকশা করা হয়। নারকেলের সঙ্গে চালের আটা ও চিনি মিশিয়ে পুলিপিঠা তৈরি করা হয়। পুলিপিঠার এক পাশে হাতের আঙ্গুল ও নখের সাহায্যে নকশা তোলা হয়, যা দেখতে ফুলের পাপড়ির মতো। পাকোয়ান পিঠায় বিচিত্র নকশা আঁকায় নৈপুণ্যের জন্য বৃহত্তর ময়মনসিংহের নারীদের খ্যাতি রয়েছে। আবার বৈচিত্র্যময় পিঠা তৈরিতে বরিশাল ও বিক্রমপুর অঞ্চলের মেয়েদের খ্যাতি রয়েছে।

নকশার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পিঠার বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়। যেমন শঙ্খলতা, কাজললতা, চিরল বা চিরনপাতা, হিজলপাতা, সজনেপাতা, উড়িয়াফুল, ভ্যাট ফুল, পদ্মদীঘি, সাগরদীঘি, সরপুস, চম্পাবরণ, কন্যামুখ, জামাইমুখ, জামাইমুচড়া, সতীনমুচড়া প্রভৃতি। পিঠার এ নামগুলো বিশেষ ভাবব্যঞ্জক।