১৯৭১

তাঁদের খুঁজে বেড়াই

আপডেট : ০৮ জুন ২০২১, ২১:০০

জ্যোতির্ময় ধর

চট্টগ্রামের পাহাড়তলি বধ্যভূমির কেবল একটা গর্ত থেকে ১১০০ মাথার খুলি পাওয়া গিয়েছিল। সেই বধ্যভূমিতে এরকম প্রায় ১০০টি গর্ত ছিল। আর WCFC-র হিসাব অনুসারে সারা দেশে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে ৯৪২টি। বেশ কিছুদিন আগে আমার স্যার কিংশুক দাশ চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধে দুজন অপরিচিত শহিদের ব্যাপারে একটা পোস্ট দিয়েছিলেন। আমি সেটা পড়ে সেই দুই শহিদের ব্যাপারে উত্সাহী হই। সেই শহিদ দুজন পি সি বর্মন এবং তাঁর সন্তান রতন বর্মন।

শ্রী প্রবোধ চন্দ্র বর্মন, যিনি পি সি বর্মন নামেই পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন তত্কালীন চট্টগ্রাম ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালক, যেটা এখন জনতা ব্যাংক। পাকিস্তানিরা এই ব্যাংক হস্তগত করতে ১৯৬৮ সালে কৌশলে তাঁকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জেলে দিয়েছিল। জেলে তাঁর সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের ঐ সময়কার তুখোড়  নেতারা—কমরেড পূর্ণেন্দু দস্তিদার, কমরেড শাহ আলম, এস এম ইউসুফ প্রমুখ।

কমরেড শাহ আলমের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, পি সি বর্মন সুপুরুষ ছিলেন, রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি ছিল তাঁর। তিনি ছিলেন নির্বিরোধ, মার্জিত এবং সংস্কৃতমনা। জেলে কমিউনিস্ট পার্টির লোকজনের সান্নিধ্যে আসার কারণে তিনি ধীরে ধীরে বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। জেলে বসে তিনি নিজে কবিতা লিখে রাজবন্দিদের পড়ে শোনাতেন। ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল তাঁর কর্মস্থল ইউনিয়ন ব্যাংক কার্যালয় থেকে পাকিস্তান আর্মি তাঁকে তুলে নিলেও তাঁর মার্জিত ও ভদ্র ব্যবহারে তাঁকে আবার ছেড়ে দেয়। পরের দিন ৮ এপ্রিল সন্ধ্যার দিকে পাকিস্তান আর্মি, রাজাকারদের সহায়তায় নন্দন কানন ১ নম্বর গলির বাসা ঘেরাও করে এবং এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে, যে গুলির দাগ এখনো তাঁর বাসভবনে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এসে নন্দন কানন পুকুরপাড়ে গুলি করা হয় এবং মৃতদেহ ওখানেই পুঁতে  ফেলা হয়। তাঁর সমাধি সংরক্ষণ এখন জরুরি বলে মনে করি।

পুত্র রতন কুমার বর্মন চট্টগ্রামে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি সংগঠক হিসেবে শহর ত্যাগ করেন। তিনি তাঁর বাবা শ্রী প্রবোধ চন্দ্র বর্মনকে বারবার শহর ত্যাগের ব্যাপারে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবা চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে কোথাও যাননি। গোপন সূত্রে খবর পেয়েছিলেন যে তাঁর বাবার জীবন বিপন্ন। তাই বাবাকে শহর থেকে নিয়ে যেতে তিনি কর্ণফুলির ওপাড় থেকে আসার সময় চাক্তাই ঘাটে রাজাকারদের হাতে সন্ধ্যায় ধরা পড়েন। পাকিস্তান আর্মিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাঁকে গুলি করে মারা হয় এবং লাশ ছুড়ে ফেলা হয় কর্ণফুলিতে।

অনেকের অজানা এই দুই শহিদের কথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের তথ্য ও দলিলে উল্লেখ নেই।