রাজশাহীতে করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে মাত্র ৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দুই নারীসহ চার জন, রংপুরে চার জন ও নাটোরে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। বাগেরহাটের মোংলায় করোনায় দুই জন ও করোনা পরীক্ষা করাতে এসে আরো দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে সাতক্ষীরায় লকডাউন আরো এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে এবং জয়পুরহাটে সর্বোচ্চ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় লকডাউন মানাতে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন। এছাড়া ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুড়িগ্রামসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনা সংক্রমণের হার বাড়ছে।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী জানান, করোনার ‘নতুন হটস্পট’ রাজশাহীতে করোনা সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। বুধবার দুইটি ল্যাবে ৪০৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে ১৬৯ জনের করোনা পজিটিভ আসে। যা আগের দিনের চেয়ে ১ দশমিক ২২ শতাংশ বেড়ে শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৮৪ শতাংশে। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আরো ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের সাত জন করোনা পজিটিভ, বাকিদের উপসর্গ ছিল। মৃতদের মধ্যে ৯ জন রাজশাহীর ও তিন জন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা। রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, গত ১ জুন থেকে ৮ জুন সকাল পর্যন্ত হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেছেন ৯২ জন। এর মধ্যে ৪৫ জনের করোনা পজিটিভ এবং বাকিদের উপসর্গ ছিল।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, করোনা উপসর্গ নিয়ে মাত্র ৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ (সমাকে) হাসপাতালে দুই নারীসহ চার জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা হলেন—আশাশুনি উপজেলার কাটাখালকী গ্রামের মো. কামরুজ্জামান সানা, সাতক্ষীরা শহরের আমতলা এলাকার আব্দুল খালেকের স্ত্রী মোছা. রিজিয়া খাতুন, সদর উপজেলার পরানদহা গ্রামের মোছা. রূপবান বিবি ও একই উপজেলার গায়েশপুর গ্রামের রুহুল কুদ্দুস।
এনিয়ে জেলায় করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেল কমপক্ষে ২৪০ জন ব্যক্তি। আর আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন অর্ধশতাধিক। এদিকে সাতক্ষীরায় করোনা সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বিতীয় দফায় আরো এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম দফার ৭ দিনের লকডাউন আজ শেষ হবে। এরপর থেকে দ্বিতীয় দফার লকডাউন শুক্রবার রাত ১২টার পর শুরু হয়ে চলবে আগামী ১৭ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত।
রংপুর বিভাগে করোনায় নতুন আক্রান্ত ১৩০ জন ৪ জনের মৃত্যু
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর জানান, রংপুর বিভাগে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪১৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে ১৩০ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ সময়ে রংপুরে ১ জন, লালমনিরহাটে ২ জন এবং দিনাজপুর জেলায় ১ জনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে বিভাগে ৪২৩ জনের মৃত্যু হলো। এদিকে রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় এই বিভাগের দিনাজপুরে ৪৩, ঠাকুরগাঁয় ৩৯, রংপুরে ১৯, লালমনিরহাটে ১১, কুড়িগ্রামে ১০, গাইবান্ধায় ৫, নীলফামারীতে ২ এবং পঞ্চগড় জেলায় ১ জন করে করোনায় আক্রান্ত হন।
নাটোর প্রতিনিধি জানান, করোনা সংক্রমণ রোধে নাটোর ও সিংড়া পৌরসভা এলাকায় ৭ দিনের লকডাউন সফল করতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠ তদারকি করছে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে গণপরিবহন ও মানুষ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশকে তত্পর দেখা গেছে। নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. কাজী মিজানুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরো ৩ জন মারা গেছেন। মৃতরা হলেন-নীচাবাজার এলাকার রেন্টু, সদর উপজেলার প্রকৌশলী কার্যালয়ের কার্য সহকারী নবী আহমেদ ও বঙ্গোজ্জল এলাকার উত্তম কুমার। এ নিয়ে ভাইরাসটিতে জেলায় মোট ৩৩ জনের মৃত্যু হলো।
মোংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, মোংলায় করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা পরীক্ষা করাতে এসে দুই জন মারা যান। তারা হলেন রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের ফুলপুকুর পাড়ের রফিকুল ইসলামের স্ত্রী তহুরুননেছা খুকি ও মোংলার মালগাজী গ্রামের নুর আলমের ছেলে ইব্রাহিম। এছাড়া বুধবার রাতে করোনা নিয়ে মারা যান নতুন কবরস্থান এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে আসলাম ও মাছমারা এলাকার খালেক।
জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, জেলায় গত দুই দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক ব্যক্তি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। করোনায় আক্রান্তের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় লকডাউন মানাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা প্রশাসনসহ পুলিশ বিভাগ ও পৌরসভা। জেলা সিভিল সার্জন ডা. ওয়াজেদ আলী জানান, জেলায় বুধবার ৩৭৮টি নমুনা পরীক্ষায় ১০১ জনের শরীরে করোনা ধরা পড়ে। যা জেলার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এ অবস্থায় আগামী ১৪ জুন পর্যন্ত ঘোষিত লকডাউনে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখা, মাস্ক না পরা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানায় কঠোরভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
ঝিনাইদহ থেকে ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহে করোনা সংক্রমণের হার বেড়েই চলেছে। বৃহস্পতিবার এ জেলায় ৫৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২১ জন নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার শতকরা ৩৬ ভাগ। এ পর্যন্ত জেলায় মোট ৩ হাজার ৫২ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। মোট মারা গেছে ৭৭ জন।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, সীমান্তবর্তী এলাকার পাশাপাশি এবার জেলা শহরেও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রমণ। এক দিনে জেলায় ৮০ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৩৭ জনের করোনা শনাক্ত হওয়ায় শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ২৫ শতাংশে। এ পর্যন্ত জেলায় ১০ হাজার ৭৩০ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলাফল পাওয়া গেছে ১০ হাজার ৩৮০ জনের।
ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য মাইকিংসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণা চালালেও তা কাজে আসছে না। এদিকে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় দিন দিন করোনা সংক্রমণের মাত্রা বেড়েই চলছে। গত এক সপ্তাহে শিশুসহ ৬ জন করোনায় আক্রান্ত হন। সেই সঙ্গে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন উপজেলাবাসী।
খুলনার করোনা হাসপাতালে ঠাঁই নেই
এদিকে খুলনা অফিস জানায়, খুলনায় প্রতিদিনই করোনা শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। ফলে ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। যে কারণে নতুন রোগী ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বেড খালি সাপেক্ষে রোগী ভর্তি করছে কর্তৃপক্ষ। খুলনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল সূত্র জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত করোনা হাসপাতালে ভর্তি ছিল ১২৬ জন রোগী। যার মধ্যে ৫৫ জন রেড জোনে ও ২৯ জন ইয়োলো জোনে রয়েছেন। এছাড়া আইসিইউতে ১২ জন এবং এইচডিইউতে ৩০ জন রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হন ৫০ জন রোগী। অপরদিকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেন ৪৭ জন। দুপুরে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩০ জন। ১০০ শয্যার হাসপাতালে ধারণক্ষমতার বাইরে ১৩০ জন রোগী ভর্তি থাকায় যেমন চিকিত্সক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, তেমনই রোগীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এ অবস্থায় আরো অন্তত ৩০টি বেড বৃদ্ধির জন্য চিকিত্সক ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী চেয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
