পারিবারিক জীবন ও শিশুর বিকাশ

আপডেট : ১১ জুন ২০২১, ২১:০৪

এই যান্ত্রিক জীবনে প্রতিটি মানুষ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাপন, দৈনন্দিন জীবনের কর্মধারা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এককালে বিনোদনটা ছিল সামাজিক রীতিনীতি চর্চার মিলনমেলা। সব বয়স-শ্রেণির মানুষ সেই মেলায় আগ্রহের সঙ্গে অংশ নিত। বয়োজ্যেষ্ঠরা তাদের জীবনের বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার গল্প সবাইকে শোনাতেন; সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাদের কথা শুনত। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বিনোদনের রূপ পালটে গেছে। এখন বিনোদন মানে ইন্টারনেটের রঙিন ভুবন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই ভার্চুয়াল জগতে মানুষ সময় কাটিয়ে দিচ্ছে এবং এটাকেই বিনোদনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

মানুষের অবশ্যপূরণীয় মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিত্সা ও শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ বিনোদনও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য। বিনোদনের বিভিন্ন উপকরণ বা বিনোদন মাধ্যমের পর্যাপ্ততা বহুমাত্রিক। কাজেই এই চাহিদাকে কোনোমতেই এককেন্দ্রিক করার সুযোগ নেই। বরং তা ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভরশীল। কেউ-বা আনন্দের জন্য বিনোদন খোঁজে, আবার কেউ নিজেই বিনোদনের উত্স। মানুষের পারিপার্শ্বিকতা, পরিবার, সহকর্মী, সহপাঠী ইত্যাদিই একজনের বিনোদন তথা নির্মল আনন্দ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। অভিজাত বা জৌলুসময় পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর বিনোদন আর গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর আনন্দ বা বিনোদনের মাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।

সমসাময়িক কালে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। বিশেষ করে, করোনা ভাইরাসজনিত (কোভিড-১৯) রোগের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারির ফলে সর্বত্রই মানুষের মধ্যে অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও মানসিক অবসাদ স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথে আজ বড় অন্তরায়। প্রথম দিকে লকডাউন বা সরকারি ছুটি সবাই উপভোগ করলেও দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ছুটিই মানসিক যন্ত্রণা ও পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন বা সেলুলয়েডের বিনোদন; কোনো কিছুই আর আনন্দ দিতে পারছে না। সবাই এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কবে ফিরে আসবে স্বাভাবিক জীবন।

বাংলাদেশে গত মার্চ ৮, ২০২০-এ প্রথমবারের মতো তিন জনের দেহে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর ধাপে ধাপে ছুটির মেয়াদ বাড়িয়ে তা অদ্যাবধি বলবত্ আছে। নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সীমিত পরিসরে হলেও দূরশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

আমাদের দৈনন্দিন অভ্যস্ত জীবনে একাকিত্বে ভোগে বাচ্চারা। তাই এই লকডাউনে শিশুদের সঙ্গে চমত্কার সময় কাটানো যেতে পারে। শিশুদের ঘরে আবদ্ধ রেখে যদি শুধু টিভি, অনলাইন বা কম্পিউটার বিনোদনের মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে সে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। পরবর্তী জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। ভার্চুয়াল লাইফ বা টিভিতে অভ্যস্ত না করে তার হাতে তুলে দেওয়া উচিত চমত্কার সব বই। যে বই তাকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

শিশুকে সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন কল্পনাশক্তির বিকাশসাধন। নিয়মমাফিক পড়াশোনার চাপে শিশুদের নিজস্ব চিন্তাচেতনা অনেক ক্ষেত্রেই বিকশিত হয় না। এই সময়ে তাদের পছন্দ-অপছন্দগুলো জেনে নেওয়া যেতে পারে। সৃষ্টিশীল কাজে আরো বেশি উত্সাহী করা যেতে পারে। ছোটবেলা মানেই খেলাধুলা। তবে মোবাইল ফোনে যতই গেমস থাকুক না কেন, খেলার প্রকৃত আনন্দ সেখানে পাওয়া যায় না। যেহেতু এখন মাঠে গিয়ে খেলা সম্ভব নয়, তাই পরিবারের সবাই মিলে লুডু, ক্যারম, দাবা, লুকোচুরি, শব্দ তৈরির ওয়ার্ড গেমস খেলে পরিবারের সঙ্গে সময়টা কাটিয়ে দিতে পারে। ছোটদের পাশাপাশি বড়রাও কিছু সময়ের জন্য হারানো শৈশবে ফিরে যেতে পারবে।

নানান ব্যস্ততার কারণে আমাদের বাসস্থানটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যায় না। এই লকডাউনের বদৌলতে বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও পরিচ্ছন্নতায় অংশ নিতে পারে। ঘরের টুকটাক জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা, নিজের টেবিল, বইপত্র জায়গামতো রাখা। এতে করে শিশুরা বাবা-মায়ের পরিশ্রমটা কিছুটা উপলব্ধি করতে পারবে। আবার বাড়ির সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বাগান করতে শিশুদের উত্সাহিত করা যেতে পারে। যাদের বাগান করার মতো জায়গা নেই; তারা বারান্দা অথবা জানালার গ্রিলে ছোট ছোট পাত্রে গাছ লাগাতে পারেন। এতে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়।

স্বাভাবিক সময়ে বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সহপাঠ্যক্রমিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সময় স্বল্পতার কারণে শিক্ষার্থীদের উক্ত প্রতিযোগিতাসমূহে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এই বন্ধে তারা ঝালাই করে নিতে পারে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে। কে জানে হয়তো এদের মধ্যে থেকেই বেরিয়ে আসবে বিশ্বখ্যাত কোনো এক প্রতিভা।

বর্তমান যুগে শিশুরা টিভি ও ভার্চুয়াল লাইফটাকেই বেশি পছন্দ করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভির সামনে বসে অন্য সংস্কৃতির অনুষ্ঠান দেখার চেয়ে নিজের দেশের শিক্ষণীয় অনুষ্ঠানসমূহ দেখতে আগ্রহী করা যেতে পারে। যেমন—সিসিমপুর, মনের কথা, শিশুতোষ চলচ্চিত্র, মীনা কার্টুন ইত্যাদি। বিনোদনের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় শিশুদের সচেতনতা বাড়াতে এই অনুষ্ঠানগুলো ভূমিকা রাখছে। এই অনুষ্ঠানগুলো জীবনযাপনের শিক্ষণীয় অনেক কিছু দেখায়, যা শিশুদের মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এছাড়া বাংলাদেশে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান আছে। জ্ঞানের পিপাসা বাড়াতে এসব দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যেতে পারে। স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এলে সে যখন ঐ স্থানগুলোতে বেড়াতে যাবে, তখন তার আনন্দ বহু গুণে বেড়ে যাবে।

গত বছরের শুরুতে করোনা নামক মহামারি স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো পৃথিবীকে। বদলে দিয়েছে আমাদের ছকে গড়া জীবনটাকে। শিশুদের চার দেওয়ালের ভেতরে সময় পার করতে হচ্ছে; যা শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিবেশে শিশুকে রক্ষা করতে হলে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।

n লেখক :অধ্যক্ষ, সিলেট ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ