অতনু আদিত্য
‘ফ্যাক্টরি’ শব্দটা শুনলেই আমাদের কল্পনায় চলে আসে বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, নোংরা দুর্গন্ধময় পরিবেশ, ক্যামিকেল, ডাস্ট আরো কত কী। কিন্তু একবার ভাবুন তো এমন একটি ফ্যাক্টরির কথা—যেখান থেকে আর সব ফ্যাক্টরির মতো কালো ধোঁয়া বের হবে না, নোংরা দুর্গন্ধময় মারাত্মক পরিবেশ দূষণকারী রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থ বের হবে না। যেখানে থাকবে কর্মচারী-শ্রমিকদের জন্য সবুজ গাছের ছায়া, বিশাল মাঠ, বেঞ্চে শুয়ে-বসে বিশ্রাম নেওয়ার সুব্যবস্থা এবং আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। হ্যাঁ, এমন সৌন্দর্যমণ্ডিত কারখানার কথা আর কল্পনায় ভাবতে হবে না, এর বাস্তব অস্তিত্ব দেখা যাবে ময়মনসিংহের ভালুকায় সুনিভার্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের (এসএফএল) ফ্যাক্টরিতে। প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার বর্গফুট জায়গার ওপর ছয়টি আলাদা আলাদা ভবন নিয়ে এর অবস্থান। মূল কারখানা ভবন দোতলা বিশিষ্ট আরসিসি ফেব্রিকেটেড ঢালাই দিয়ে তৈরি। ইট-পাথরের এক একটি ভবন ছেয়ে আছে গাছপালা আর ফুলে ফলে। সবুজে ঘেরা সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এ কারখানায় জুতা উত্পাদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সহস্রাধিক শ্রমিক এখানে কাজ করেন, যার প্রায় ৫৫ শতাংশই নারী শ্রমিক।
বাংলাদেশের ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ ধারণা চালু করার পথিকৃত্ এই কারখানাকে বলা যায়। এটি প্রথম রফতানিমুখী পাদুকাশিল্পের একমাত্র লিড (গোল্ড) সার্টিফাইড গ্রিন ফ্যাক্টরি, যা ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করে। বাংলাদেশের প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান এবং শেয়ার বাজারে Blue Chip হিসেবে বিবেচিত ন্যাশনাল পলিমার (এনপলি) গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান, ফুটওয়্যার জাতীয় পণ্য উত্পাদন ও রপ্তানি করে আসছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন রিয়াদ মাহমুদ। তিনি কোম্পানিটির একজন উদ্যোক্তাও। তাঁর সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই কর্মচারী-শ্রমিকদের জন্য একটি নৈতিক, নিরাপদ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে চেয়েছি, যা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার মূল প্রেরণা।’
কারখানার স্থাপত্য নকশায় এমন বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে কারখানার ভেতরে সূর্যের আলো ও বাতাস প্রবাহিত হয়। কোনো ধরনের এয়ার কন্ডিশনিংয়ের ব্যবস্থা না থাকলেও কারখানার ভেতরে তাপমাত্রা সব সময় শীতল থাকে। এটি কারখানার বিদ্যুতের অপচয় অনেকাংশে রোধ করেছে। এছাড়া পুরো কারখানা গ্রিন কনসেপ্টে তৈরি হওয়ায়, চারপাশে সবুজের সমারোহের জন্য তাপদাহের দিনেও কোনো শ্রমিকই কাজ করতে গিয়ে ঘামেন না। কারণ বাইরের তাপমাত্রার চেয়ে ভেতরে অনেক ঠান্ডা। যার ফলে শ্রমিকেরা কাজ করার পরেও ক্লান্ত হয়ে পড়েন না। আর কাজের ফাঁকে বিশ্রামের জন্য রয়েছে বড় বড় মাঠ ও পুকুরপাড়, যা ফ্যাক্টরির সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ১০০ ভাগ ইকো ফ্রেন্ডলি এই কারখানা। শুধু দেখতেই সুন্দর নয়—কর্মীদের চিকিত্সা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, ভাতা, শিশুদের দেখাশোনা করার জন্য চাইল্ড কেয়ার, রয়েছে প্রার্থনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, কর্মীদের জন্য জলাধার বেষ্টিত মনোরম ডাইনিং থেকে শুরু করে সবকিছুর সুবিধাই আছে এখানে।
পরিশেষে, কারখানাটি বাংলাদেশের ফুটওয়্যার ইন্ডাট্রিজের ভাবমূর্তি বহিঃবিশ্বে সুনামের সঙ্গে উপস্থাপন করছে এবং সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী হওয়ায় দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনেরও বড় উত্স। পরিবেশদূষণ ও জলবায়ুর ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে যেখানে বাংলাদেশ তথা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও এর বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে এ ধরনের পরিবেশবান্ধব কারখানা সত্যিই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি দৃষ্টান্ত।
ঢাকা
