মামশাদ কবীর
বাংলাদেশে ১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদেরকে অপ্রাপ্ত বলা হয়। অর্থাত্ এ সময় যে কোনো অপরাধ, অনিয়ম কোনো কিছু করার পরও তাদের অন্য অপরাধীদের মতো সাজা বা দণ্ড ভোগ করতে হয় না। তাদের পাঠানো হয় শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে। একসময় তারা মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। কথা হচ্ছে, এই অপ্রাপ্ত বয়স্করাই কিন্ত প্রাপ্ত বয়স্কদের মতো বর্তমানে সবধরনের অপরাধ, অপকর্ম করে যাচ্ছে। আবার অপ্রাপ্ত হওয়ার সুযোগে আইনের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে বেরিয়েও যাচ্ছে। এটা নিয়ে দায়িত্বশীল কোনো প্রতিষ্ঠান, বিভাগ বা গোষ্ঠী কার্যকর কোনো ভূমিকাই রাখছে না। ফলে দেশে অপরাধ, অপকর্ম অর্থাত্ বেআইনি কার্যক্রম বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। কিন্তু কী কারণে যেন এ ব্যাপারে কথা বলতে অপারগ মানুষ।
এটা শতভাগ সত্যি যে, অভিভাবকেরা সন্তানদের বয়স কমিয়ে স্কুলে ভর্তি করেন। বর্তমানে নার্সারি, কেজি তারপর ওয়ান হয়ে এসএসসি পাশ করতে ১৮ বছর লেগে যাচ্ছে। অথচ এইচএসসি পাসের পরও শিক্ষার্থীদের বয়স সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১৮ পেরুতে বাকি থাকে কয়েক মাস! আর এসএসসি-এইচএসসির তকমা লাগিয়ে এই বয়সের ছেলেরা খুন থেকে শুরু করে সবধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। প্রশ্ন হলো—এটা দেখভালের দায়িত্ব কার? বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসএসসি পরীক্ষার্থীর যে বয়সটা উল্লেখ করেছি—চিকিত্সক, সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানীরা বিষয়টি নিয়ে আদৌ কোনো গবেষণা কখনো করেছেন বলে জানা নেই। গবেষণা করলে প্রাপ্ত বয়স্কদের অপ্রাপ্ত বয়স্ক বলে যে একটা অলিখিত দ্বন্দ্ব সেটা অপরাধ করার পর আলোচনায় আসত না। আমার মনে হয়, এটা অপরাধীদের দণ্ড থেকে বাঁচানোর একধরনের অপকৌশল। কথা হচ্ছে, এটা করছে কারা? আমার সামাজিক অবস্থানে থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশেষ করে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, চাকরির একটা নির্দিষ্ট বয়সসীমা নির্ধারণ করেছে সরকার। সেই হিসেবে সেশনজটের কথা ভেবে চাকরিতে প্রতিযোগিতার পর্যাপ্ত সময় না থাকায় অভিভাবকরা বয়স কমানোর এই কৌশল নিচ্ছেন।
একইভাবে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের যানবাহন চালানোও নিষিদ্ধ। বিদেশে শ্রম বিক্রিও নিষিদ্ধ। আমাদের দেশে প্রতিটি জনপদে প্রতিদিন হাজার হাজার অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর পিক-আপ, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি, অটোরিকশা, ইজিবাইক, রিকশাভ্যান চালাচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের বাহনে বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করছে হাজার হাজার মানুষ। অনেক সময় ঘটছে দুর্ঘটনা, হতাহত হচ্ছেন অনেকেই। সারা জীবন পঙ্গুত্ব নিয়ে অনেকেই বেঁচে থাকছেন। দুর্ঘটনার পর গুরুত্ব বুঝে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারীরা আবিষ্কার করেন—ফিটনেসবিহীন গাড়ি, রং সাইড দিয়ে চালিয়েছিল, ঘুমাচ্ছিল অথবা বেপরোয়া গতিই কারণ। এগুলো তো আগে দেখার বিষয়। একইভাবে নগরে-বন্দরে, শহরে বা অজপাড়াগাঁয়ে বেপরোয়া মোটরসাইকেল নিয়ে অপ্রাপ্তরা ছুটে চলছে বিভিন্ন গন্তব্যে। যার খবর রাখেন না অভিভাবক কিংবা পরিবারের দায়িত্বশীল কেউ। একসময় সন্তান বখে যায়, কখনো নানা অপরাধ, মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ে, আবার কখনো বেপরোয়াভাবে চালাতে গিয়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হচ্ছে। বিষয়টি একদিকে অভিভাবকদের খামখেয়ালি, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বহীনতার মধ্যে পড়ে। সড়কে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালিত যানবাহন আটকে দেওয়া হলে এই অনৈতিক কাজটি বন্ধ হতো। ঝুঁকিতে থাকতে হতো না সাধারণ মানুষকে। বাইক চালাতে গিয়ে সড়ক-মহাসড়কে প্রায় সময় দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে অনেক শিক্ষার্থী, কিশোর। পুলিশ আটকাচ্ছে চালক, গাড়ি। শিক্ষার্থী বা কিশোরের বন্ধু/সহযোগীরা রাস্তা অবরোধ বা যানবাহন ভাংচুর করে সম্পদের ক্ষতি করছে। অথচ এই অপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী বা কিশোরটির সড়ক-মহাসড়কে বাইক চলাচলে পুলিশের ভূমিকা কঠোর হলে, প্রথমত তার মৃত্যু ঠেকানো যেত, চালককে জেলে বা আদালতে যেতে হতো না, যানবাহন ভাংচুরের ঘটনাও ঘটত না। সরকারি কাজে রাষ্ট্রের মূল্যবান সময় নষ্ট হতো না।
এদিকে রাষ্ট্র চিত্কার করছে শিশুশ্রম নিয়ে। দেখা যাচ্ছে শত শত কিশোর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ম্যানেজ করে বয়স লুকিয়ে বা বাড়িয়ে শ্রমিক হিসেবে পাড়ি দিচ্ছে বিভিন্ন দেশে। সমাজ, রাষ্ট্রের এই দ্বিমুখীতা কি অপরাধ, অপকর্ম নিয়ন্ত্রিত করছে না বাড়াচ্ছে? এর দায়ভার আর কতদিন রাষ্ট্র বা সমাজকে ভোগ করতে হবে? এটা একটা জাতির সামগ্রিক অগ্রগতিতে কতটা প্রতিবন্ধক সেটা ভাবার সময় কি এখনো আসেনি? না বুঝতে বাকি—কী করণীয় এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণের জন্য?
কুমিল্লা
