কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে ওইসিডি

আপডেট : ১১ জুন ২০২১, ২১:০৬

g শফিকুর রহমান রয়েল

 

দ্য অর্গানাইজেশান ফর ইকোনমিক কো-অপারেশান অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) ইউরোপ, আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩৭টি দেশের একটি সংস্থা। অনেকের মনেই ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, এটি অনেক আগে থেকেই শুধু অতিধনী দেশগুলোর একটি জোট। কিন্তু, কার্যত তা মোটেই নয়, খুব বেশি দিন আগে অর্থনৈতিক অবস্থার আহামরি উন্নতি হয়নি, এমন অনেক রাষ্ট্রও এর গর্বিত সদস্য। তবে এটি সত্য, এর সদস্যরা ও মূল অংশীদাররা বিশ্বের মোট বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ৮০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। ওইসিডির মূল লক্ষ্য হচ্ছে এর সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক কল্যাণের উন্নয়ন। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বাইরেও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাহায্যের চেষ্টার সমন্বয় সাধন করে থাকে। ফলে, এর কর্মসূচিগুলো বিশ্বব্যাপী ১০০টিরও বেশি দেশে অর্থনৈতিক সংস্কার বর্ধনে সহযোগিতা জোগায়। অতএব, বোঝাই যাচ্ছে, ওইসিডি শুধু তাদের অধিভুক্ত দেশগুলোর চিন্তাই করে না। মূলত তারা পুরো বিশ্বের অর্থনীতি নিয়েই ভাবে।

 ওইসিডির মূল সদর দপ্তরের ঠিকানা হচ্ছে, ২, রু আন্দ্রে পাসকেল, ৭৫৭৭৫ প্যারিস সিডেক্স, ফ্রান্স। বার্লিন, মেক্সিকো সিটি, টোকিও এবং ওয়াশিংটন ডিসিতেও এর অফিস রয়েছে। ওইসিডি-কে শুরুতে ডাকা হতো অর্গানাইজেশান ফর ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কো-অপারেশান বা ওইইসি বলে। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে ইউরোপ পুনর্গঠনে মার্শাল পরিকল্পনা চালুর উদ্দেশে। এই ওইইসির প্রাথমিক মূল লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় সরকারসমূহকে তাদের অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরতা চিহ্নিত করতে সাহায্য করা। এভাবেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল শিকড়গুলোর একটিতে রূপ নিয়েছিল এই ওইইসি। মার্শাল পরিকল্পনা সম্পন্ন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ওইইসি-তে যোগ দেয়।

১৯৬০ সালের ১৪ ডিসেম্বর এর নাম পালটে হয় ওইসিডি। এটি পূর্ণোদ্যমে, কাজ শুরু করে ১৯৬১ সালেন ৩০ ডিসেম্বর থেকে। ওইসিডিভুক্ত বর্তমান ৩৭টি দেশের অধিকাংশই ইউরোপের। আর তারা হচ্ছে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স,  জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গেরি, আইসল্যান্ড, ইতালি, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পোল্যানাড, পর্তুগাল, স্লোভাক প্রজাতন্ত্র, স্লোভেনিয়া, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য। আমেরিকার রয়েছে পাঁচটি দেশ—কানাডা, চিলি, কলাম্বিয়া, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া। মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিনিধিত্ব করছে কেবল তুরস্ক ও ইসরাইল। ওইসিডি সংস্থায় যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি খুবই দীর্ঘ এবং জটিল। একটি রাষ্ট্র এর সদস্য হতে চাইলে ইতিমধ্যে বর্তমান কয়েকটি সদস্য কর্তৃক বারবার পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। ওইসিডি উপকরণসমূহ, মান ও মাপকাঠি সম্পর্কে তারা সবুজ সংকেত দিলেই কেবল অগ্রসর হওয়ার প্রসঙ্গ আসে। সদস্য হওয়ার আগে বিভিন্ন ক্ষেত্রের মান পূরণ করতে নিজেদের অর্থনীতির সংস্কারের জন্যে রাজি থাকতে হয়, অন্যথায় অযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে, যেমন করপোরেট পরিচালনা, দুর্নীতি দমন ও পরিবেশ সুরক্ষা। ওইসিডিতে ব্রাজিল, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পদবি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য অংশীদার, কিন্তু সদস্য নয়। এদেরকে এখনো সদস্য বানানোর যোগ্য মনে করছে না ওইসিডি।

ওইসিডি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যেকটিরই প্রবৃদ্ধির উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণই শুধু নয়, রিটোর্টও প্রকাশ করে। অধিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাস সম্পর্কে প্রয়োজনে পরামর্শ দেয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে আবহাওয়ার ওপর প্রভাবের ভারসাম্যও বজায় রাখতে বাধ্য করে ওইসিডি। এর বিভিন্ন কমিটি উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন নীতির সুপারিশ। সদস্যসমূহ কে কীভাবে নীতি বাস্তবায়ন করবে, তা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তবে, করতে হবে অবশ্যই। নইলে সদস্যের তালিকা থেকে বাদ পড়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়। ওইসিডির কারণেই তাদের প্রত্যেকটি দেশের দ্বিপাক্ষিক কর চুক্তির একটা মান রয়েছে। এর ফলে তাদের মধে আন্তঃসীমানার বাণিজ্য ক্রমপ্রসারমান। এক দেশের ইমেইল আরেক দেশ আটকে দেওয়ার কোনো বিধান নেই। এছাড়াও আরো বিভিন্ন চুক্তির ফলস্বরূপ সবগুলো দেশেই করপোরেট ব্যবসা পরিচালনার নীতিমালা ক্রমশই উন্নীত হচ্ছে।

 দুই বছর অন্তর অন্তর ওইসিডি তার অর্থনৈতিক আভাস প্রকাশ করে। ওইসিডির অর্থনৈতিক আভাসে তাদের ৩৭টি সদস্য রাষ্ট্র ছাড়াও বৃহত্ অংশীদারদের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। ওইসিডি অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা থেকেই তারা প্রত্যেকটি দেশকেই বলে দেয়, এখন কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়? তারা প্রতি মাসের মার্চ মাসে তাদের রিপোর্ট হালনাগাদ করে। করোনা প্রাদুর্ভাব শুরুর আগে ওইসিডি বিশ্ব অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। তারা লিখেছিল, তেজোদ্দীপ্ত বিনিয়োগ, বর্ধিষ্ণু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উচ্চ চাকরির ফায়দাটা আরো ভালোভাবে বিশ্বের কাজে লাগানো উচিত। সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিল বাণিজ্য যুদ্ধের ব্যাপারে। আরো বলেছিল, বাণিজ্যবাদে প্রত্যাবর্তন করলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়তে বাধ্য। যার পরিণতি ভোগ করছে বর্তমান বিশ্ব। বহু প্রণোদনা দিয়েও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না বহু দেশকে। তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য আদৌ ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রবল সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

—দ্য ব্যালেন্স অনুসরণে