করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গতকাল শুক্রবার বিকাল ৫টা থেকে ১৭ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বাত্মক কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে প্রশাসন। ফলে ট্রেনসহ সব প্রকার গণপরিবহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট বন্ধ থাকায় কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে গোটা মহানগর। গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আরো ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৩৫৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। মৃতদের আট জন রাজশাহীর, ছয় জন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ও একজন নাটোরের।
এদিকে সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে খুলনা জেলায় এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। গতকাল জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন। আগামী রবিবার থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। অন্যদিকে সাতক্ষীরা ও নোয়াখালীতে লকডাউনের আওতা আরো সাত দিন বাড়ানো হয়েছে।
রামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌসের বরাত দিয়ে রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, মৃতদের সাত জন করোনা পজিটিভ ও বাকিদের উপসর্গ ছিল। পজিটিভ চার জন রাজশাহীর, দুই জন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ও এক জন নাটোরের। এদিকে হঠাত্ রাজশাহী শহরে সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণায় বাস ও ট্রেনের টিকিট কেটে রাখা যাত্রীরা বিপাকে পড়েন। যাত্রীদের অগ্রিম টিকিটের টাকা ফেরত দিতে দেখা যায়। এ সময় বহু যাত্রীকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। শত শত মানুষকে ভোর থেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে রাজশাহী ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে দেখা গেছে। সকালে নগরীর সাহেববাজার কাঁচাবাজারে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। সপ্তাহের খাবার, ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে মানুষ বাজারে ভিড় জমায়।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (সদর) গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, লকডাউনের খবর শুনে লোকজন একটু বেশি কেনাকাটা করছেন। এ কারণে নগরে সকাল থেকেই অন্যদিনের চেয়ে বেশি ভিড় ছিল। তবে বিকাল পাঁচটা থেকে সর্বাত্মক লকডাউন শুরু হয়। নগরীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। টহলে আছে র্যাব সদস্যরাও।
চলতি মাসের ১১ দিনে রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মৃত ১০৮ জনের মধ্যে ৬৩ জন পজিটিভ ছিলেন। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন আরো ৪৩ জন। করোনার এমন ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণে বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহী মহানগর এলাকায় সর্বাত্মক লকডাউনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে রাজশাহীতে দুই দফা বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল জেলা প্রশাসন। কিন্তু সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় সর্বাত্মক লকডাউন দেওয়া হয়।
সামাজিক সংক্রমণ চলছে!
রাজশাহীর সিভিল সার্জন কাইয়ুম তালুকদার জানান, প্রকোপ দেখে মনে হচ্ছে সামাজিক সংক্রমণ হচ্ছে। সংক্রমিতদের আলাদা করতে বা আইসোলেশনে রাখতে বাড়ানো হয়েছে পরীক্ষা। সিভিল সার্জন অফিস সূত্র মতে, ৯ জুন সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় সংক্রমিত হয়েছে ৩৫৩ জন। এর মধ্যে শহরের বাসিন্দাই ৩০০। অর্থাত্ জেলার সংক্রমণের ৭৭ শতাংশই নগরীর বাসিন্দা। সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত স্পট সাহেববাজার। সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক সময় অ্যান্টিজেন টেস্টে নেগেটিভ হলেও আরটিপিসিআরে পজিটিভ আসে। যেসব এলাকায় ভিড় বেশি, সে এলাকাতে সংক্রমণের হারও বেশি। এ চিত্র প্রমাণ করে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় সামাজিক সংক্রমণ চলছে। এদিকে সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণার পর শুক্রবার থেকেই রাজশাহীর সব যাত্রীবাহী ট্রেন সাত দিন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে আরো ছয় জনের মৃত্যু
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ছয় করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৬৮ জন। এ পর্যন্ত মারা গেছে ৬৪ জন। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৪৪ জন। জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে জেলায় করোনা শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। তবে আগের দুদিন শনাক্তের হার ছিল ১৯ দশমিক ১৯ শতাংশ। জেলায় করোনা সংক্রমণ রোধে গত ৭ জুন থেকে আগামী ১৬ জুন বুধবার পর্যন্ত ১ সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ চলছে।
খুলনায় রবিবার থেকে বিধিনিষেধ
খুলনা অফিস জানায়, জেলায় বিকাল ৫টার পর কোনো দোকান, শপিংমল, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি খোলা রাখা যাবে না। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ির বাইরে বের হয়ে অযথা ঘোরাঘুরি করতে পারবে না। ইজিবাইক চলবে অর্ধেক এবং অর্ধেকসংখ্যক যাত্রী নিয়ে। সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, গত এক সপ্তাহ খুলনার কয়েকটি জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করে সংক্রমণ প্রতিরোধে কোনো ভালো ফল পাওয়া যায়নি। এজন্য সমগ্র জেলায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভায় সদর হাসপাতালকে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত হয়। সভায় জানানো হয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আরটিপিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে; সেখানে প্রতিদিন ৫০০ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। উল্লেখ্য, জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ১৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আক্রান্ত হয়েছে ১১ হাজার ৯১ জন। শুক্রবার শনাক্ত হয়েছে ১৫৬ জন। এটা এখন পর্যন্ত এ মাসের সর্বোচ্চ।
সাতক্ষীরা ও নোয়াখালীতে লকডাউন বাড়ল
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, করোনার সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বিতীয় দফায় জেলায় আরো এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির এক ভার্চুয়াল সভায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লকডাউনে মুদি দোকান ও কাঁচাবাজার সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, জেলায় চলমান লকডাউনের সময়সীমা আরো সাত দিন অর্থাত্ ১৮ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে জেলা করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে কমিটির এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গতকাল সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার জানান, জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৯৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত মারা গেছে ১২৫ জন ও মোট আক্রান্ত ৯ হাজার ৪৭৩ জন।
