ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আরো প্রণোদনা প্রয়োজন :সিপিডি

আপডেট : ১২ জুন ২০২১, ২২:১৬

Åভ্যাট বাস্তবায়ন করা গেলে করপোরেট  

   কর আরো কমানো যেত : পরিকল্পনামন্ত্রী

Åরাষ্ট্রের দায়িত্ব বেকারদের সহায়তা করা 

    :অধ্যাপক রেহমান সোবহান

Åঅগ্রিম কর ব্যবসার খরচ বাড়াবে

    :এফবিসিসিআই সভাপতি

ইত্তেফাক রিপোর্ট

কোভিডকে মাথায় রেখে এবারের বাজেট হয়নি। দেশে দরিদ্র, নিম্নবিত্তদের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে সরাসরি কিছু উল্লেখ করা হয়নি। করোনার প্রভাবে দেশে নিম্নআয়ের অনেকেই দরিদ্র হয়ে পড়েছে। ফলে আয় বৈষম্য ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আরো প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। গতকাল শনিবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপে এ কথা বলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে আয়োজিত সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। সংলাপটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, করপোরেট ট্যাক্স কমানো হয়েছে। এটা আরো কমানো যেত, ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা যেত। যদি আমরা ভ্যাটকে আরো সুন্দর ভাবে ব্যবহার করতে পারতাম। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটা অদ্ভুত দেশ, যেখানে ভ্যাট দিলে ব্যবসা কমে যাবে বলা হয়, অথচ ভ্যাট দেন ভোক্তারা’। রেমিট্যান্সে প্রণোদনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যখন অর্থ প্রতিমন্ত্রী ছিলাম তখন থেকে রেমিট্যান্সে প্রণোদনার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এখন দুই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। যারা ক্ষুদ্র কাজ করে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন, বড় চাকরি করে টাকা পাঠাচ্ছেন সবাই এই প্রণোদনা পাচ্ছেন। যদি আমরা নির্দিষ্ট করে দরিদ্রদের দিতে পারতাম সেক্ষেত্রে এই প্রণোদান ৪ শতাংশের সুপারিশ করতাম। করোনার প্রভাবে দেশে দারিদ্র্য হার বেড়ে যাচ্ছে এমন বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দারিদ্র্য হার বেড়ে যাওয়ার কথা বলছেন। তবে এটা নিয়ে আরো কাজ করতে হবে।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, বেকারদের সহায়তা দিতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নতুন বেকারদের সহায়তা করা। অর্থমন্ত্রী কর কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে চাইছেন। কিন্তু এর জন্য কর্মসংস্থান তৈরিতে আরো দুই-এক বছর সময় প্রয়োজন। তৈরি পোশাকশিল্প সুগঠিত। এ খাতে বেকারদের পরীক্ষামূলক ভাবে ভাতা চালু করা যেতে পারে। যারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে, নীতি নির্ধারণে তাদের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মূল উপস্থাপনায় ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কর ছাড় দিলে বিনিয়োগ বাড়বে, এটা ঠিক নয়। বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। করোনার প্রভাব কতদিন থাকবে সেটা অনিশ্চিত। দেশে করোনার টিকা কার্যক্রমের জন্য বাজেটে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল রাখার কথা বলা হয়েছে। বাস্তবতা বিবেচনায় এটা পর্যাপ্ত নয় বলে তিনি মনে করেন। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১০ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ২৫ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। এই বাস্তবায়ন দিয়ে আমরা কীভাবে কোভিড মোকাবিলা করতে পারব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য। আগের বাজেটে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এবারের বাজেটে সংস্কারের কথা কিছুই নেই।

সম্মাননীয় অতিথির বক্তব্যে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি বলেন, তথ্যের ঘাটতি শুধু নয়, তথ্যের অসংগতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিসংখ্যন ব্যুরোর (বিবিএস) সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ দেশে নতুন দারিদ্র্য বেড়েছে কি না সেটি তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে আসতে হবে। তিনি বলেন, শ্রমশক্তি জরিপ হয়েছে ২০১৬ সালে কিন্তু ২০২১ সালের যে বাস্তবতা সেটা ঐ জরিপের তথ্য দিয়ে বোঝা যাবে না। যতদিন পরিসংখ্যান নিয়ে ভিন্ন মত থাকবে ততদিন আমরা সঠিক রেজাল্ট পাব না। 

আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, করপোরেট ট্যাক্স কমানোর দাবি ছিল সেটা করা হয়েছে। কিন্তু অগ্রিম কর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দাবি ছিল এই অগ্রিম কর পুরোপুরি উঠিয়ে দেওয়া। কারণ অগ্রিম কর দেওয়ার ফলে ব্যবসার খরচ আরো বেড়ে যাবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সংস্কারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, করের নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করতে হবে। এটা আমাদের জোর দাবি। তিনি বলেন, দেশে যারা কর দেয় তাদের ওপরই কর আরোপ করা হয়। অথচ দেশে উপজেলা পর্যায়ে অনেকেরই কর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।

মেট্রোপলিটন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার নিহাদ কবির বলেন, অনেকেই বলেন বাজেট ব্যবসাবান্ধব। এবারের বাজেটে সবকিছু ব্যবসায়ীদের দেওয়া হয়েছে। কিন্তু করপোরেট কর কমানোর দাবি কোভিডের আগেই ছিল। কারণ প্রতিযোগী ও প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে করপোরেট করহার অনেক বেশি। বাজেট পাশের আগে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ আসতে পারে এমন কথা শোনা যাচ্ছে, এটি সুযোগ দেওয়া সঠিক হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।  তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এর সিনিয়র সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসাবান্ধব বলতেই পারি। তবে পোশাক খাতের জন্য তেমন পরিবর্তন হয়নি। কর প্রণোদনা যাই হোক সেটি কমপক্ষে পাঁচ বছরের জন্য নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। কারণ প্রতিবার কর পরিবর্তন হলে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বাধাগ্রস্ত হয়। বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজাতে হবে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় প্রতি মাসে ২৫ লাখ টিকা দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু এ টিকা কোত্থেকে আসবে সেটি বলা নেই। তাছাড়া এই হারে টিকা দেওয়া হলে কমপক্ষে চার বছর লেগে যাবে।